নিজস্ব প্রতিবেদন, কলকাতা: রাজ্য তথা দেশজুড়ে যখন স্মার্ট মিটারের বিরুদ্ধে ক্ষোভের আগুন জ্বলছে, ঠিক তখনই আগুনে ঘি ঢালল নবান্নের এক নতুন নির্দেশিকা। সর্বস্তরের সরকারি কর্মচারী এবং রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থার কর্মীদের আবাসনে বাধ্যতামূলকভাবে স্মার্ট ইলেকট্রিক মিটার বসানোর নির্দেশ জারি করেছে রাজ্য সরকার। গত ১০ জুন মুখ্যসচিবের দফতর থেকে জারি হওয়া এই কড়া নির্দেশিকাকে কেন্দ্র করে ইতিমধ্যেই তৈরি হয়েছে তীব্র বিতর্ক। আর এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ উগরে দিয়েছে রাজ্যের অঘোষিত বিরোধীদল সিপিআইএম।
কেন এই পদক্ষেপ? নবান্নের যুক্তি
নবান্ন সূত্রের দাবি, কেন্দ্রীয় সরকারের ‘রিভ্যাম্পড ডিস্ট্রিবিউশন সেক্টর স্কিম (RDSS)’-এর আওতায় দেশজুড়ে বিদ্যুৎ ক্ষেত্রে বড়সড় সংস্কারের ডাক দেওয়া হয়েছে। মূলত বিদ্যুৎ বণ্টন সংস্থাগুলোর (DISCOMs) বিপুল আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ কমাতেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এই কেন্দ্রীয় প্রকল্পের নির্দেশিকা ও শর্ত মেনেই পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য বিদ্যুৎ বণ্টন সংস্থা (WBSEDCL) প্রথম দফায় সরকারি কর্মীদের আবাসনকে পাখির চোখ করে স্মার্ট মিটার বসানোর কাজ শুরু করতে বাধ্য হচ্ছে।
পুরোনো অবস্থান ভুললেন মুখ্যমন্ত্রী?
তবে নবান্ন যতই সংস্কারের যুক্তি দিক, রাজনৈতিক মহলের বড় অংশ মনে করিয়ে দিচ্ছে, বিরোধী দলনেতা থাকাকালীন এই স্মার্ট মিটারের বিরুদ্ধে কার্যত যুদ্ধ ঘোষণা করেছিলেন শুভেন্দু অধিকারী। ভোটের আগে সাধারণ মানুষের পকেট কাটার এই ব্যবস্থার বিরুদ্ধে একাধিকবার মুখ খুলেছিলেন। কিন্তু ক্ষমতা এসেই ভোল বদলে নিজেই মানুষের পকেট কাটতে শুরু করেছেন। পশ্চিম মেদিনীপুর জেলা সিপিআইএমের সম্পাদক বিজয় পালের তোপ— “মোদির বন্ধু আদানি এখন দেশের সব থেকে বড় স্মার্ট মিটার প্রস্তুতকারক কোম্পানির মালিক। দিন কয়েক আগে নবান্নে রাজ্য সরকারের শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে দেখা করে যান গৌতম আদানির ছেলে করণ আদানি। আর তার পরেই সরকারের এই নতুন ফরমান। ফলে স্পষ্ট মানুষের জন্য নয়, নতুন সরকার কেন্দ্রের মতো আদানিদের স্বার্থ রক্ষা করতেই ক্ষমতায় এসেছে। বামপন্থীরা এর আগেও এই জনবিরোধী প্রকল্পের বিরুদ্ধে ছিল। ভবিষ্যতেও রাস্তার আন্দোলন আরও তীব্র করে স্মার্ট মিটারের ফাঁদ থেকে মানুষকে রক্ষার লড়াই জারি রাখবে।”
পকেট কাটার নতুন ফন্দি? লাভ কার?
উপভোক্তা এবং বিশেষজ্ঞদের একাংশের দাবি, এই স্মার্ট মিটারের ফলে সাধারণ মানুষের বিন্দুমাত্র লাভ তো হবেই না, উল্টে হু হু করে বাড়বে বিদ্যুতের খরচ। প্রিপেইড বা পোস্টপেইড— যে ব্যবস্থাই হোক না কেন, মিটারের চড়া মাশুল এবং গোপন চার্জের ধাক্কায় মধ্যবিত্তের পকেট ফাঁকা হতে বাধ্য। সরকারি সংস্থাগুলোর তথাকথিত ‘আর্থিক ক্ষতি’ মেটানোর নামে কেন সাধারণ মানুষের স্বার্থ জলাঞ্জলি দিয়ে এই সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে, তা নিয়ে ইতিমধ্যেই বামপন্থীদের নেতৃত্বে রাজ্যজুড়ে গড়ে উঠছে স্বতঃস্ফূর্ত জনআন্দোলন।
তামিলনাড়ুর নজির তুলে প্রশ্ন
স্মার্ট মিটার বিতর্কে তামিলনাড়ুর সাম্প্রতিক অবস্থানও সামনে আনছে বামপন্থীরা। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত খবর অনুযায়ী, মুখ্যমন্ত্রী বিজয়ের নেতৃত্বাধীন তামিলনাড়ু সরকার রাজ্যে বৃহৎ আকারের স্মার্ট মিটার প্রকল্পের আর্থিক ও প্রশাসনিক দিকগুলি নতুন করে খতিয়ে দেখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বিরোধীদের দাবি, প্রকল্প বাস্তবায়নের আগে জনস্বার্থ, ব্যয় এবং গ্রাহকদের উপর সম্ভাব্য প্রভাব সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়ন হওয়া উচিত।
সিপিআইএমের প্রশ্ন, যখন অন্য রাজ্যগুলি প্রকল্পের বিভিন্ন দিক পুনর্বিবেচনা করছে, তখন পশ্চিমবঙ্গে কেন সাধারণ মানুষের উদ্বেগ এবং আপত্তিকে যথেষ্ট গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে না?
প্রথম দফায় ‘বলির পাঁঠা’ সরকারি কর্মীরাই!
নির্দেশিকায় বলা হয়েছে, রাজ্যের মোট ৫৫৪টি কাস্টমার কেয়ার কেন্দ্রের মধ্যে প্রাথমিক পর্যায়ে ১০৩টিকে চিহ্নিত করা হয়েছে, যেখানে বণ্টনজনিত ক্ষতি সবচেয়ে বেশি। অর্থাৎ, সিস্টেমের ত্রুটি ও চুরির কারণে হওয়া ক্ষতির দায় পরোক্ষভাবে চাপানো হচ্ছে আমজনতা ও সরকারি কর্মীদের ঘাড়ে। নির্দেশ অনুযায়ী, রাজ্য কোষাগার থেকে যাঁরা বেতন বা সাম্মানিক পান, তাঁদের এই নির্দেশ মানতেই হবে।
ওয়াকিবহাল মহলের মতে, সাধারণ মানুষের তীব্র ক্ষোভের মুখে পড়ে প্রথম দফায় সরকারি কর্মচারীদের ‘বলির পাঁঠা’ বানাতে চাইছে প্রশাসন, যাতে পরবর্তীতে এই প্রতিবাদের সুর নরম করে বাকিদের ওপরেও এই নিয়ম জোর করে চাপিয়ে দেওয়া যায়। সব মিলিয়ে, বিদ্যুৎ সংস্কারের নামে নবান্নের এই ‘স্মার্ট’ চাল আগামী দিনে রাজ্য রাজনীতিকে আরও উত্তপ্ত করে তুলবে, সেই ইঙ্গিত স্পষ্ট।