জ্ঞানেশ কুমারের পদে থাকার অধিকার নেই, দুই নির্বাচন কমিশনারের চিঠির বিস্ফোরক বিষয়বস্তু প্রকাশ পেতেই আক্রমণে ঝাঁপাল CPI(M)

নয়াদিল্লি, ২৩ সেপ্টেম্বর: দুই নির্বাচন কমিশনের পত্রাঘাতে বড় বিপদে মুখ্যনির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার। ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা SIR নিয়ে বিতর্ক এবার সরাসরি পৌঁছে গেল নির্বাচন কমিশনের অন্দরমহলে। সর্বভারতীয় সংবাদমাধ্যম দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-এর ২৩ সেপ্টেম্বরের অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, গত ১০ মাসে অন্তত ১৪ বার নির্বাচন কমিশনের দুই সদস্য—সুখবীর সিং সান্ধু এবং বিবেক যোশী—কমিশনের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত ও নির্দেশ নিয়ে লিখিত আপত্তি জানিয়েছেন। তাঁদের অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছে নতুন ভোটার অন্তর্ভুক্তি, ভোটার বাদ দেওয়া ও পুনর্বহাল, SIR-সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত এবং ভোটার তালিকার তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণ।

এই রিপোর্ট সামনে আসার পর মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারকে ঘিরে রাজনৈতিক চাপ আরও বেড়েছে। CPI(M)-এর পলিটব্যুরো বিবৃতি প্রকাশ করে দাবি করেছে, জ্ঞানেশ কুমারের আর পদে থাকার কোন অধিকার নেই। একই সঙ্গে অবিলম্বে SIR বন্ধ এবং নির্বাচন কমিশনের স্বচ্ছতা ও গণতান্ত্রিক কার্যপ্রণালী পুনঃস্থাপনের দাবি জানিয়েছে দল।

১০ মাসে ১৪ বার আপত্তি

Indian Express-এর রিপোর্ট অনুযায়ী, নির্বাচন কমিশনার সুখবীর সিং সান্ধু এবং বিবেক যোশী গত ১০ মাসে অন্তত ১৪ বার লিখিতভাবে আপত্তি জানিয়েছেন। একদিনে চারটি আপত্তিও নথিভুক্ত হয়েছিল।

দুই কমিশনারের আপত্তির বিষয়গুলি ছিল নির্বাচন কমিশনের মূল দায়িত্বের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত—নতুন ভোটারদের নাম অন্তর্ভুক্তি, ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়া, বাদ পড়া ভোটারদের পুনর্বহাল এবং SIR-সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত। আপত্তিগুলির প্রতিলিপি মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের কাছেও পাঠানো হয়েছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত জ্ঞানেশ কুমার যে কোনও পদক্ষেপ করেননি সে বিষয়ে তা বলাই বাহুল্য।

Form-6 বদল নিয়েও আপত্তি

নতুন ভোটার হিসেবে নাম নথিভুক্তির জন্য ব্যবহৃত Form-6-এ SIR-সংক্রান্ত নতুন প্রশ্ন যুক্ত করা নিয়েও আপত্তি জানিয়েছিলেন দুই নির্বাচন কমিশনার।

Indian Express-এর রিপোর্টে বলা হয়েছে, নতুন ভোটারকে জানাতে হচ্ছিল তাঁর নিজের বা বাবা-মা কিংবা ঠাকুরদা-ঠাকুমার নাম আগের SIR-এর ভোটার তালিকায় রয়েছে কি না। বিবেক যোশী মে মাসেই নথিভুক্ত আপত্তিতে জানিয়েছিলেন, নিয়ম পরিবর্তন না করে এইভাবে Form-6 বদলানো যায় না। সুখবীর সিং সান্ধুও পরে এই পরিবর্তনকে ‘অননুমোদিত’ এবং ‘আইনবিরুদ্ধ’ বলে উল্লেখ করেন বলে রিপোর্টে দাবি করা হয়েছে।

ভোটার তালিকার নিয়ন্ত্রণ কি দিল্লিতে কেন্দ্রীভূত?

বিতর্কের আরও একটি বড় জায়গা ভোটার তালিকার তথ্যভান্ডার। ভারতের নির্বাচনী ব্যবস্থায় Electoral Registration Officer বা ERO-দের ভোটার তালিকা প্রস্তুত ও সংশোধনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ আইনগত দায়িত্ব রয়েছে। কিন্তু Indian Express-এর অনুসন্ধান অনুযায়ী, দুই নির্বাচন কমিশনার আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন যে ভোটার তালিকার ডেটাবেসের নিয়ন্ত্রণ ধীরে ধীরে কেন্দ্রীয়ভাবে দিল্লিতে কেন্দ্রীভূত হচ্ছে।

বিবেক যোশী মে মাসে ‘gradual centralisation of the electoral roll database’ নিয়ে সতর্ক করেছিলেন বলে রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁর প্রস্তাব ছিল, সংশ্লিষ্ট আইনসিদ্ধ আধিকারিক ছাড়া অন্য কেউ ভোটার ডেটাবেসে পরিবর্তন করতে পারছেন না—তা নিশ্চিত করতে অডিট করা হোক। এমনকি সান্ধুও পরে অভিযোগ করেন, রাজ্যস্তরের আধিকারিকরা ERONet-এ যথাযথ ও সম্পূর্ণ প্রবেশাধিকার পাচ্ছেন না।

পশ্চিমবঙ্গেও প্রশ্ন: আপিল করল কে?

SIR নিয়ে পশ্চিমবঙ্গে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, তার সঙ্গেও দুই কমিশনারের আপত্তির যোগ রয়েছে বলে ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।

রিপোর্ট অনুযায়ী, SIR-এর পরে পশ্চিমবঙ্গে ২৭ লক্ষেরও বেশি ভোটারের নাম বাদ পড়ে। পরে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলি নিয়ে বিচারপ্রক্রিয়া শুরু হয়। কমিশন আদালতকে জানিয়েছে, প্রায় ৩৮ লক্ষ আপিল বিচারাধীন—এর মধ্যে ২২.২১ লক্ষ আবেদন এসেছে বাদ পড়া ভোটারদের নাম পুনর্বহালের জন্য।

অন্যদিকে প্রায় ১৬.১০ লক্ষ আপিল করা হয়েছে এমন ভোটারদের বিরুদ্ধে, যাঁদের সংশ্লিষ্ট আধিকারিকরা তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন।

এই দ্বিতীয় ধরনের আপিল নিয়েই প্রশ্ন তুলেছিলেন নির্বাচন কমিশনার সুখবীর সিং সান্ধু। তাঁর প্রশ্ন ছিল—নির্বাচন কমিশনের হয়ে ওই আপিলগুলি করার অনুমতি কে দিয়েছিল এবং কে সেগুলি দায়ের করেছিলেন? তিনি আরও জানিয়েছিলেন, অন্য নির্বাচন কমিশনার বিবেক যোশী এবং পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক—কেউই এই প্রক্রিয়া সম্পর্কে অবহিত ছিলেন না বলে রিপোর্টে দাবি করা হয়েছে।

গোয়ার ৯৭ ভোটারের কাহিনী

Indian Express-এর অনুসন্ধান অনুযায়ী, SIR-এ ‘logical discrepancy’ হিসেবে চিহ্নিত কিছু ভোটারকে নথি জমা দিয়ে নিজেদের অবস্থান ব্যাখ্যা করার সুযোগ দিয়েছিল সুপ্রিম কোর্ট। গোয়ার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ERO-রা ৯৭ জন ভোটারের নথি পরীক্ষা করে তাঁদের চূড়ান্ত ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্তির যোগ্য বলে মনে করেছিলেন।

কিন্তু সমস্যা তৈরি হয় সফটওয়্যারে। ERO-দের সেই সিদ্ধান্ত নথিভুক্ত করে আগের বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা সফটওয়্যারে সক্রিয় ছিল না বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।

গোয়ার মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিকের দফতর ১১ থেকে ১৭ ফেব্রুয়ারির মধ্যে আট বার সংশ্লিষ্ট আধিকারিকদের কাছে এই ব্যবস্থা চালুর আবেদন করেছিল। কিন্তু সময়মতো সেই সুবিধা সক্রিয় না হওয়ায় ওই ৯৭ জনের নাম চূড়ান্ত ভোটার তালিকায় ওঠেনি বলে Indian Express জানিয়েছে।

সংখ্যাটি ৯৭ হলেও ঘটনাটির তাৎপর্য অনেক বড়—কারণ এখানে স্থানীয় আইনসিদ্ধ আধিকারিক কোনও ভোটারকে যোগ্য বলে সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরেও সেই সিদ্ধান্ত সফটওয়্যার ব্যবস্থায় কার্যকর করা যায়নি বলে অভিযোগ উঠেছে।

‘CEC একা সিদ্ধান্ত নিতে পারেন না’

এই বিতর্কে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে নির্বাচন কমিশনের সাংবিধানিক কাঠামো।

Article 324-এর অধীনে নির্বাচন কমিশন একটি তিন সদস্যের সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান। মুখ্য নির্বাচন কমিশনার এবং অন্য দুই নির্বাচন কমিশনার সমমর্যাদার সদস্য। ২০২৩ সালের সংশ্লিষ্ট আইনের ১৮ নম্বর ধারায় বলা হয়েছে, কমিশনের কাজকর্ম যতটা সম্ভব সর্বসম্মতভাবে পরিচালিত হবে। মতভেদ হলে সংখ্যাগরিষ্ঠ মত অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেওয়ার বিধান রয়েছে।

Indian Express-এর রিপোর্টে বলা হয়েছে, দুই কমিশনার তাঁদের নথিতেও এই বিধানের উল্লেখ করে কমিশনের নামে প্রকাশিত বিভিন্ন নির্দেশের অনুমোদন নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন।

কপিল সিব্বলের দাবি: সংখ্যাগরিষ্ঠতা ছাড়া সিদ্ধান্ত বাতিল হোক

এই পরিস্থিতিতে সরব হয়েছেন রাজ্যসভার সাংসদ কপিল সিব্বল। ২৩ সেপ্টেম্বর সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় তাঁর দাবি, ২৫ জুন ২০২৫-এর পর নির্বাচন কমিশনের যে সিদ্ধান্তগুলি দুই কমিশনারের আপত্তি সত্ত্বেও সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে নেওয়া হয়নি, সেগুলিকে কমিশনের বৈধ সিদ্ধান্ত হিসেবে গণ্য করা উচিত নয়।

সিব্বলের দাবি, সংখ্যাগরিষ্ঠতার অনুমোদন ছাড়া নেওয়া সমস্ত সিদ্ধান্ত বাতিল ঘোষণা করা হোক। তাঁর অভিযোগ, দুই কমিশনার আপত্তি জানালেও মুখ্য নির্বাচন কমিশনার নিজের মতো সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

এর আগেও SIR নিয়ে কড়া মন্তব্য করেছিলেন সিব্বল। ২১ সেপ্টেম্বর তিনি অভিযোগ করেছিলেন, বৈধ ভোটারদের নাম বাদ দেওয়া এবং অবৈধ ভোটারদের নাম যুক্ত করার মতো পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে। SIR-এর নোটিস তাঁকেও দেওয়া হয়েছিল বলে তিনি জানিয়েছিলেন।

কমিশনের বক্তব্য

নির্বাচন কমিশন সূত্রের দাবি করা হয়েছিল, SIR-সহ ভোটার তালিকা সংশোধনের সমস্ত সিদ্ধান্তই তিন সদস্যের অনুমোদন নিয়ে সর্বসম্মতভাবে নেওয়া হয়েছে। The Tribune-কে কমিশন সূত্র জানিয়েছে, আলোচনা বা সিদ্ধান্ত গ্রহণের সময় সদস্যদের মধ্যে পর্যবেক্ষণ বা মতভেদ থাকতে পারে, কিন্তু চূড়ান্ত সিদ্ধান্তগুলি সর্বসম্মত ছিল।

তবে Indian Express জানিয়েছে, তাদের পাঠানো প্রশ্নের জবাবে নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে কোনও প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।

CPI(M)-এর নিশানায় জ্ঞানেশ কুমার

এই পরিস্থিতিতেই CPI(M)-এর পলিটব্যুরো সরাসরি মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের ভূমিকার তীব্র সমালোচনা করেছে। দলের বক্তব্য, দুই নির্বাচন কমিশনারের লিখিত আপত্তি এবং SIR-এর বাস্তবায়ন নিয়ে প্রকাশ্যে আসা তথ্য নির্বাচন কমিশনের প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতা ও গণতান্ত্রিক কার্যপ্রণালী নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলছে।

CPI(M)-এর দাবি, জ্ঞানেশ কুমারকে অবিলম্বে পদ থেকে সরাতে হবে এবং SIR প্রক্রিয়া বন্ধ করার দাবিও জানিয়েছে দল।

নির্বাচন কমিশনার নিয়োগের আইন বদলের দাবি

শুধু মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের ভূমিকা নয়, নির্বাচন কমিশনার নিয়োগের নতুন যে আইন বিজেপি সরকার করছে তাও বাতিলের দাবি তুলেছে সিপিআইএম।

দলের দাবি, বর্তমান নিয়োগ সংক্রান্ত আইন বাতিল করে নির্বাচন কমিশনার বাছাইয়ের ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রী, লোকসভার বিরোধী দলনেতা এবং ভারতের প্রধান বিচারপতিকে নিয়ে একটি নির্বাচন কমিটি গঠনের দাবি জানিয়েছে দল।

SIR বিতর্ককে CPI(M) নির্বাচন কমিশনের স্বচ্ছতা, সিদ্ধান্ত গ্রহণের পদ্ধতি, তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণ এবং ভোটাধিকার রক্ষার প্রশ্ন নিয়েও সরব হয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *