১৮ পেরোনোর আগেই বিয়ে, দেশে সবচেয়ে বেশি পশ্চিমবঙ্গে, শিক্ষার অভাবেই বাড়ছে সমস্যা!

নিজস্ব প্রতিবেদন: বাল্য বিবাহ সমস্যায় পশ্চিমবঙ্গ সবার শীর্ষে। মেয়েদের বিয়ের ন্যূনতম বয়স ১৮ বছর। আইন আছে, সচেতনতা বাড়ানোর নানা উদ্যোগও রয়েছে। তবু ১৮ বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই বিয়ের ঘটনা এখনও দেশের বহু প্রান্তে বাস্তবতা। আর জাতীয় পরিবারের স্বাস্থ্য সমীক্ষা—৫ (NFHS-5)-এর পরিসংখ্যান বলছে, এই ক্ষেত্রে দেশের মধ্যে সবচেয়ে উদ্বেগজনক অবস্থান পশ্চিমবঙ্গের।

NFHS-5-এর ২০১৯-২১ সালের তথ্য অনুযায়ী, ২০ থেকে ২৪ বছর বয়সি মহিলাদের মধ্যে ৪১.৬ শতাংশের বিয়ে হয়েছিল ১৮ বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই। জাতীয় গড় সেখানে ২৩.৩ শতাংশ। অর্থাৎ, দেশের গড়ের তুলনায় পশ্চিমবঙ্গে এই হার বেশি উদ্বেগজনক।

শিক্ষার সঙ্গে সরাসরি যোগ

বাল্যবিবাহের পিছনে শুধু সামাজিক রীতি বা পারিবারিক সিদ্ধান্ত নয়, শিক্ষার সুযোগ এবং আর্থিক অবস্থারও বড় ভূমিকা রয়েছে। NFHS-5-এর পশ্চিমবঙ্গ-ভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, কোনও প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নেই এমন মেয়েদের ৫৮ শতাংশের বিয়ে ১৮ বছরের আগে হয়েছে। উচ্চশিক্ষা পাওয়া মেয়েদের ক্ষেত্রে সেই হার মাত্র ৪ শতাংশ।

অর্থনৈতিক অবস্থার সঙ্গেও রয়েছে স্পষ্ট সম্পর্ক। সবচেয়ে নিম্ন আর্থিক স্তরের পরিবারের মেয়েদের মধ্যে ৫৬ শতাংশের বিয়ে ১৮ বছরের আগে হয়েছে। সবচেয়ে উচ্চ আর্থিক স্তরের পরিবারের ক্ষেত্রে এই হার ১৩ শতাংশ।

অর্থাৎ, মেয়েকে স্কুলে ধরে রাখা, উচ্চশিক্ষার সুযোগ তৈরি করা এবং পরিবারের আর্থিক নিরাপত্তা বাড়ানো—বাল্যবিবাহ ঠেকানোর ক্ষেত্রে এই তিনটি বিষয়ই গুরুত্বপূর্ণ।

তালিকার শীর্ষে পশ্চিমবঙ্গ

বাল্যবিবাহের হারে পশ্চিমবঙ্গের পরেই রয়েছে বিহার—৪০.৮ শতাংশ। তৃতীয় ত্রিপুরা—৪০.১ শতাংশ। ঝাড়খণ্ডে এই হার ৩২.২ শতাংশ এবং অসমে ৩১.৮ শতাংশ।

তবে এই পরিসংখ্যানের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল—এগুলি ২০১৯-২১ সালের NFHS-5-এর তথ্য। ফলে এগুলিকে ২০২৬ সালের সরাসরি বর্তমান পরিস্থিতির পরিসংখ্যান হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। বরং সাম্প্রতিকতম পূর্ণাঙ্গ জাতীয় সমীক্ষায় সমস্যাটির মাত্রা কতটা ছিল, তার ছবি এই তথ্য দেয়।

পাঁচ বছরেও বদলাল না বাংলার ছবি

আরও উদ্বেগের জায়গা হল, আগের সমীক্ষার তুলনায় পশ্চিমবঙ্গে পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়নি। NFHS-4-এও ২০-২৪ বছর বয়সি মহিলাদের মধ্যে ৪১.৬ শতাংশের বিয়ে ১৮ বছরের আগে হয়েছিল। NFHS-5-এও সেই হার ৪১.৬ শতাংশ। অর্থাৎ পাঁচ বছরের ব্যবধানে এই সূচকে কার্যত কোনও পরিবর্তন হয়নি।

যদিও দীর্ঘ সময়ের হিসাব কিছুটা আশার ছবি দেখায়। NFHS-3 অর্থাৎ ২০০৫-০৬ সালে পশ্চিমবঙ্গে এই হার ছিল ৫৪ শতাংশ। ২০১৫-১৬-তে তা কমে ৪১.৬ শতাংশে আসে। কিন্তু তার পরের পাঁচ বছরে সেই হার আর কমেনি।

জেলার ছবিতেও বড় ফারাক

রাজ্যের সব জেলায় পরিস্থিতি এক নয়। NFHS-5-এর জেলা-ভিত্তিক তথ্য অনুযায়ী, পশ্চিম মেদিনীপুরে ২০-২৪ বছর বয়সি মহিলাদের ৫৫.৭ শতাংশের বিয়ে ১৮ বছরের আগে হয়েছিল। পূর্ব মেদিনীপুরে এই হার ৫৭.৬ শতাংশ এবং মুর্শিদাবাদে ৫৫.৪ শতাংশ। পূর্ব বর্ধমানে ৫০.৪ শতাংশ এবং মালদহে ৫৬.৮ শতাংশ।

অন্য দিকে জলপাইগুড়ি, পশ্চিম বর্ধমান, উত্তর দিনাজপুর, দক্ষিণ ২৪ পরগনা এবং পুরুলিয়ার মতো কয়েকটি জেলায় আগের সমীক্ষার তুলনায় উন্নতির ছবিও দেখা গিয়েছে। অর্থাৎ রাজ্যের মধ্যে সমস্যাটির মাত্রা সর্বত্র এক নয়।

সূত্র: National Family Health Survey-5 (২০১৯-২১), UNICEF, পশ্চিমবঙ্গ সরকারের কন্যাশ্রী প্রকল্প, ভারত সরকারের তথ্য।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *