নয়াদিল্লি: যুদ্ধের আবহেই দিল্লিতে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। শুক্রবার ভোরে ইন্দিরা গান্ধী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছলেন তিনি। ১৮তম ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনে যোগ দিতেই তাঁর ভারত সফর। বিমানবন্দরে তাঁকে স্বাগত জানান বিদেশ মন্ত্রকের প্রতিমন্ত্রী কীর্তি বর্ধন সিংহ। পুতিনের সফর ঘিরে ইতিমধ্যেই আন্তর্জাতিক কূটনীতির নজর ঘুরে এসেছে নয়াদিল্লির দিকে।
কারণটা শুধু ভারত-রাশিয়া সম্পর্ক নয়। ইউক্রেন যুদ্ধ এখনও শেষ হয়নি। সেই যুদ্ধের অভিঘাত ছড়িয়েছে জ্বালানি বাজার থেকে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, কূটনীতি থেকে নিরাপত্তা-সমীকরণে। তার মধ্যেই বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উদীয়মান শক্তিগোষ্ঠী ব্রিকসের বৈঠকে যোগ দিতে পুতিনের দিল্লি আসা আলাদা তাৎপর্য বহন করছে।
শুক্রবারই প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সঙ্গে পুতিনের দ্বিপাক্ষিক বৈঠক হওয়ার কথা। দুই দেশের বাণিজ্য, অর্থনৈতিক সহযোগিতা, প্রতিরক্ষা, প্রযুক্তি-সহ একাধিক বিষয়ে আলোচনা হতে পারে। ইউক্রেন যুদ্ধের প্রেক্ষিতে শান্তি ও কূটনীতির প্রশ্নটিও বৈঠকে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। রুশ প্রেসিডেন্টের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ এর আগে জানিয়েছিলেন, ইউক্রেন সংঘাতের শান্তিপূর্ণ সমাধানে ভারতের উদ্যোগকে মস্কো স্বাগত জানায়।
যুদ্ধের ছায়া ব্রিকসের মঞ্চেও
১২ ও ১৩ সেপ্টেম্বর নয়াদিল্লিতে বসছে ১৮তম ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলন। পুতিনের পাশাপাশি চিনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং এবং ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান-সহ একাধিক রাষ্ট্রনেতার উপস্থিতি এই সম্মেলনকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। ইউক্রেন যুদ্ধের পাশাপাশি পশ্চিম এশিয়ার সংঘাত, বিশ্ব অর্থনীতি, বাণিজ্য এবং জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনা হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
বিশেষ করে ব্রিকসের সম্প্রসারণের পর গোষ্ঠীটির রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক গুরুত্ব অনেকটাই বেড়েছে। ভারত, রাশিয়া, চিনের পাশাপাশি ইরান, সংযুক্ত আরব আমিরশাহি, সৌদি আরব, ইন্দোনেশিয়া, মিশর, ইথিওপিয়া-সহ একাধিক দেশ এখন এই মঞ্চের অংশ। ফলে কোনও আন্তর্জাতিক সঙ্কটে ব্রিকসের অবস্থান কী হয়, তা আগের চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে।
মোদী-পুতিন বৈঠকে নজর
ভারত-রাশিয়া সম্পর্কের পুরনো সমীকরণের পাশাপাশি এবারের বৈঠকে বাণিজ্য ও জ্বালানি সহযোগিতার দিকেও নজর থাকবে। প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে দীর্ঘদিনের সহযোগিতা, প্রযুক্তি ও যৌথ উৎপাদন নিয়েও আলোচনা হতে পারে। রুশ সূত্রের বক্তব্য অনুযায়ী, দুই দেশের অর্থনৈতিক সহযোগিতা আরও বাড়ানোর সম্ভাবনা রয়েছে।
অন্য দিকে, ব্রিকসের মঞ্চে চিনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের উপস্থিতিও ভারতের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। সাত বছর পর তাঁর ভারত সফর হচ্ছে। ফলে মোদী-পুতিন বৈঠকের পাশাপাশি মোদী-শি বৈঠক এবং রাশিয়া-চিন সমীকরণও দিল্লির কূটনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রে থাকবে।
ইউক্রেন থেকে পশ্চিম এশিয়া—এক মঞ্চে বহু সঙ্কট
এ বারের ব্রিকস সম্মেলন এমন এক সময়ে হচ্ছে, যখন ইউক্রেন যুদ্ধের পাশাপাশি পশ্চিম এশিয়াতেও তীব্র সংঘাত চলছে। ইরান-সংক্রান্ত সঙ্কট ইতিমধ্যেই ব্রিকসের ভিতরের দেশগুলির মধ্যে অবস্থানগত পার্থক্য সামনে এনেছে। ফলে অভিন্ন অবস্থান বা যৌথ ঘোষণাপত্র তৈরি করাও সহজ হবে না বলে মনে করা হচ্ছে।
তার মধ্যেই ভারত চাইছে ব্রিকসকে অর্থনৈতিক সহযোগিতা, বহুপাক্ষিকতা এবং উন্নয়নশীল দেশগুলির স্বার্থের একটি গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চ হিসাবে আরও শক্তিশালী করতে। সীমান্তের যুদ্ধ থেকে বিশ্ব বাণিজ্য—সব ক্ষেত্রেই যখন পুরনো আন্তর্জাতিক সমীকরণ বদলাচ্ছে, তখন দিল্লির ব্রিকস সম্মেলন তাই নিছক আর একটি কূটনৈতিক বৈঠক নয়।
ইউক্রেন যুদ্ধের আবহে পুতিনের দিল্লি সফর, চিনা প্রেসিডেন্টের উপস্থিতি এবং পশ্চিম এশিয়ার সংঘাত—সব মিলিয়ে আগামী দু’দিন নয়াদিল্লির ব্রিকস মঞ্চ থেকেই আন্তর্জাতিক রাজনীতির বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বেরিয়ে আসতে পারে। নজর তাই গোটা বিশ্বের।