গরু নেই, তাও বিজেপি নেতাদের পরিবারে ঢুকল গোয়াল তৈরির ১ লাখ ৭০ হাজার টাকা করে

নিজস্ব সংবাদদাতা, দাসপুর: ডবল ইঞ্জিনের সরকার এবার গোয়াল তৈরির জন্য বাড়িতে গরু না থাকা বিজেপি নেতাদের পরিবারে বরাদ্দ করল প্রায় ১ লাখ ৭০ হাজার টাকা করে। এমনই অভিযোগ উঠেছে পশ্চিম মেদিনীপুরের দাসপুর ব্লকের নাড়াজোলে। যা নিয়ে এলাকায় সাধারণ মানুষ থেকে বিজেপি সমর্থকরাও ক্ষিপ্ত হয়ে উঠেছেন।

সরকারি শিক্ষা ব্যবস্থা এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য রাজ্যের ডবল ইঞ্জিনের সরকারকে কোনও পদক্ষেপ করতে দেখা যায়নি। উপরন্তু ৯৩৩টি সরকারি স্কুল বন্ধের ঘোষণা করা হয়েছে। সেখানে গোয়াল তৈরির জন্য পঞ্চায়েতে পঞ্চায়েতে বরাদ্দ হচ্ছে পৌনে দু’লক্ষ টাকা করে। ইতিমধ্যেই যা নিয়ে নানান মহলে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে।

প্রশ্ন উঠছে, আবাস প্রকল্পে যেখানে মানুষের বাড়ি তৈরির জন্য ১ লক্ষ ২০ হাজার টাকা বরাদ্দ হয়, সেখানে গোয়ালের জন্য ১ লক্ষ ৭০ হাজার টাকা কেন দেওয়া হচ্ছে? শুধু তাই নয়, তা নিয়ে চলছে চরম দুর্নীতিও। যাঁদের ঘরে একটিও গরু নেই, তেমন ব্যক্তিরাও নাকি পাচ্ছেন ১ লক্ষ ৭০ হাজার টাকা। এবং তাঁদের পরিচয় খুঁজতে গিয়ে দেখা যাচ্ছে, তাঁদের পরিবারের কেউ না কেউ বিজেপির সঙ্গে যুক্ত। শুধু তাই নয়, তাঁদের পাকা একতলা বা দোতলা পাকা বাড়িও রয়েছে। এই পরিস্থিতিতে, যেখানে সবাইকে অন্নপূর্ণা ভাণ্ডারের টাকা দেওয়া হবে বলে নানা অছিলায় কার্যত নাম বাদ দেওয়া হচ্ছে, সেখানে গোয়াল তৈরির জন্য এত টাকা? প্রশ্ন উঠছে।

এই পরিস্থিতিতে এমন কিছু নাম সামনে এসেছে এই গোয়াল তৈরির টাকা প্রাপকদের তালিকায়, যা নিয়ে চরম বিতর্ক তৈরি হয়েছে। কারণ, এঁদের বেশির ভাগের বাড়িতেই গরু নেই। সবারই পাকা বাড়ি—কারও একতলা, কারও দোতলা, কারও আবার দু’টি দোতলা পাকা বাড়ি।

এই টাকা প্রাপকদের মধ্যে রয়েছেন সদ্য তৃণমূল ছেড়ে বিজেপিতে যোগ দেওয়া নেতা প্রভাস মাইতি। খাতায়-কলমে দাসপুর-১ ব্লকের হরিরাজপুরের বাসিন্দা, বেশির ভাগ সময়েই মেদিনীপুর শহরে নিজের তিনতলা পাকা বাড়িতে থাকেন। গ্রামেও দোতলা পাকা বাড়ি রয়েছে। তিনিও ‘বিকশিত ভারত গ্যারান্টি ফর রোজগার ও আজীবিকা মিশন’ প্রকল্পে গোয়াল তৈরির জন্য টাকা পেয়েছেন বলে জানা গিয়েছে। প্রভাসের বাড়িতে গোশালা তৈরির জন্য বোর্ডও লাগানো হয়ে গিয়েছে। যা নিয়ে গ্রামে চরম বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। এ বিষয়ে গ্রাম পঞ্চায়েত প্রধান ছবি বাঘরার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে বলেন, ‘তিনি কিছু বলার মতো অবস্থায় নেই। কবে কী সিদ্ধান্ত হয়েছে, তা তাঁর মনেও নেই।’

এমন ঘটনায় গ্রামের মানুষ ব্লক প্রশাসন এবং সংশ্লিষ্ট গ্রাম পঞ্চায়েত প্রধানকে লিখিত অভিযোগও দায়ের করেছেন বলে জানা গিয়েছে। দাসপুর-১ বিডিও অফিসের এক আধিকারিক বলেন, ওই গোশালা তৈরি নিয়ে গণস্বাক্ষর-সংবলিত একটি দরখাস্ত জমা পড়েছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে বিষয়টি তদন্ত করে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে রিপোর্ট জমা দেওয়া হবে। গোটা বিষয় নিয়ে প্রভাসের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, প্রশাসন তদন্ত করেই প্রকল্প মঞ্জুর করেছে। তাই এর বাইরে তিনি কোনও মন্তব্য করবেন না।

গ্রামের মানুষ বলেন, ‘ওদের ঢিপায় কোনও গরু নেই, আগেও ছিল না।’ এমন বিত্তবানদের নামে গোশালার জন্য টাকা বরাদ্দ করে বিজেপি প্রমাণ করেছে, দুর্নীতি ও দলবাজিতে তৃণমূলকে পিছনে ফেলে এগিয়ে গিয়েছে।

এমন আরও একাধিক ঘটনা সামনে এসেছে। যেমন, চন্দ্রকোনা বিধানসভার অন্তর্গত দাসপুর-১ ব্লকের নাড়াজোল গ্রাম পঞ্চায়েতে ১৫ অগস্ট ছুটির দিনে গ্রাম পঞ্চায়েত অফিসে মিটিং করে রেজোলিউশন করা হয় ৯টি পরিবারকে গোয়ালা তৈরির জন্য ১ লক্ষ ৬৮ হাজার ৬০৮ টাকা করে দেওয়ার।

তালিকায় রয়েছেন হারাধন হাজরা, বিজেপির ক্ষীরপাই মণ্ডলের সম্পাদক রাজীব হাজরার বাবা (৩১২ নম্বর বুথ)। তাঁর পাকা বাড়ি রয়েছে, বাড়িতে কোনও গরু নেই।

শক্তিপদ চৌধুরী, বিজেপির ক্ষীরপাই মণ্ডলের সদস্য সৌমেন চৌধুরীর বাবা, সীমানা গ্রাম, ৩০৯ নম্বর বুথ। আলমারি-ফার্নিচারের ব্যবসা-সহ বড় দোতলা দুটি বাড়ি রয়েছে। গরু পালন করেন না।

তপন পোড়্যা, বিজেপির বুথ শক্তিকেন্দ্র প্রমুখ রমেশ পোড়্যার বাবা, নাড়াজোল গ্রাম, ৩২২ নম্বর বুথ। পাকা বাড়ি আছে, বাড়িতে গরুও আছে। তবে তাঁর জন্য আগে থেকেই পাকা মেঝে-সহ শক্তপোক্ত গোয়ালও রয়েছে।

মহন্ত দোলুই, বিজেপির নাড়াজোল ৩২৩ নম্বর বুথের সভাপতি, পেশায় ব্যবসায়ী।

জয়দেব দোলুই, দুবরাজপুর ৩১৭ নম্বর বুথের বিজেপি সভাপতি প্রশান্ত দোলুইয়ের বাবা। দোতলা বড় পাকা বাড়ি রয়েছে। ছেলে ও নিজের ব্যবসা রয়েছে।

নিখিল দোলই, রাইকুণ্ডু ৩১৩ নম্বর বুথের বিজেপি সভাপতি। দুই ছেলে-সহ নিজে ব্যবসায়ী। গ্রামে তিনতলা পাকা বাড়ি রয়েছে। একটি গোরু ও একটি বাছুর রয়েছে বাড়ির দুধ খাওয়ার জন্য।

বিজয় দোলুই, সুপাপুড়সুড়ি ৩০৪ নম্বর বুথের বিজেপি সভাপতি। পাকা বাড়ি রয়েছে, কোনও গোরু নেই।

অরুণ মাইতি, হাজাকুণ্ডু ৩১০ নম্বর বুথের বিজেপি সভাপতি সঞ্জয় মাইতির বাবা। গ্রামে বড় দুটি পাকা বাড়ি রয়েছে, কোনও গরু নেই।

এ ছাড়া কাঁটাদরজা গ্রামের রাজীব হাজরা এবং সীমানা গ্রামের সৌমেন চৌধুরীকে দুর্নীতির দায়ে গত জুলাই মাসে বিজেপির রাজ্য শৃঙ্খলা রক্ষা কমিটি সাসপেন্ড করেছিল। তাঁদের দু’জনের বাবার নামে গোশালা বরাদ্দ হয়েছিল।

গোটা ঘটনায় এলাকায় রীতিমতো চাঞ্চল্য তৈরি হয়েছে। মানুষ এই সব বিজেপি নেতার বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে ক্ষোভ উগরে দিচ্ছেন। এখন দেখার, লিখিত অভিযোগ পাওয়ার পরেও প্রশাসন এই সব বিজেপি নেতার বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *