মোদির রাজ্যে ব্যাপক কৃষক আন্দোলন শুরু, রীতিমতো চাপে সরকার!

নিজস্ব প্রতিনিধি, মোরবি (গুজরাট): উন্নয়নের চটকদার বিজ্ঞাপনের আড়ালে গুজরাটের গ্রামীণ ক্ষোভ এবার আছড়ে পড়ল প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর নিজের রাজ্যে। রাজকোটের পর এবার মোরবি। কৃষিপ্রধান সৌরাষ্ট্র অঞ্চলে কৃষকদের জমি জোর করে কেড়ে নেওয়ার সরকারি নীতির বিরুদ্ধে তীব্র গণ-আন্দোলনের মুখে পড়েছে রাজ্যের ভূপেন্দ্র প্যাটেলের বিজেপি সরকার। মোরবির জেতপর এবং পার্শ্ববর্তী প্রায় ৩৫টি গ্রামের কৃষকদের এই স্বতঃস্ফূর্ত অনশন আন্দোলন মোদী-রাজ্যের তথাকথিত ‘উন্নয়ন মডেল’-এর আসল কঙ্কালটাকেই জনসমক্ষে বের করে এনেছে।

কৃষকদের জমি, কর্পোরেটের মুনাফা

আন্দোলনের মূল কারণ, কৃষকদের উর্বর চাষের জমির ওপর দিয়ে বেসরকারি বিদ্যুৎ কোম্পানি ও পাওয়ার গ্রিডের হাই-টেনশন লাইনের বিশাল খুঁটি বা টাওয়ার বসানো। কৃষকদের অভিযোগ, পুলিশ ও প্রশাসনের ভয় দেখিয়ে তাঁদের জমি দখল করা হচ্ছে, যার ফলে স্থায়ীভাবে নষ্ট হচ্ছে বিঘার পর বিঘা চাষের জমি।

আশ্চর্যের বিষয় হলো, ২০২১ সালে এই ধরণের প্রকল্পের জন্য কৃষকদের যে হারে ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়েছিল, ২০২৬ সালে এসে সেই ক্ষতিপূরণের পরিমাণ প্রায় অর্ধেক করে দেওয়া হয়েছে। ‘ডবল ইঞ্জিন’ সরকারের এই চরম বৈষম্যমূলক ও কৃষক-বিরোধী নীতির বিরুদ্ধেই এখন ফুঁসছে মোরবি। কৃষকদের স্পষ্ট দাবী, ২০১৩ সালের জমি অধিগ্রহণ আইন মেনে বাজারমূল্যের ৪ গুণ ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। কিন্তু পুঁজিপতিদের সুবিধা করে দিতে সরকার আইনকে বুড়ো আঙুল দেখাচ্ছে বলে অভিযোগ আন্দোলনকারীদের।

দলীয় কোন্দল ও প্রশাসনিক ব্যর্থতা

এই আন্দোলন বিজেপি সরকারের জন্য দ্বিগুণ অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে, কারণ দলের ভেতরের ক্ষোভও এবার প্রকাশ্যে। বর্তমান বিজেপি মন্ত্রীর আপন ভাই রাকেশ অমৃতিয়া স্বয়ং সরকারের নীতির সমালোচনা করে কৃষকদের পাশে দাঁড়িয়েছেন। ক্ষোভের আগুন আঁচ করতে পেরে জেলা শাসক ও পুলিশ প্রশাসন তড়িঘড়ি বৈঠক ডাকলেও, কৃষকদের একরোখা মনোভাবের কাছে তাঁদের নতিস্বীকার করতে হয়েছে। কৃষক নেতা নিকেত পঞ্চাসরার নেতৃত্বে আন্দোলনকারীরা সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, “মিষ্টি কথায় কাজ হবে না, সরকার লিখিত আশ্বাস না দিলে অনশন ভাঙবে না।”

সামাজিক চাপের মুখে নতিস্বীকারের ইঙ্গিত

​রাজনৈতিকভাবে বামপন্থী বা প্রথাগত বিরোধী দলগুলি এখানে সরাসরি নেতৃত্বে না থাকলেও, জনরোষের চাপ এতটাই বেশি যে সরকার এখন ব্যাকফুটে। পরিস্থিতি সামাল দিতে শেষমেশ পটিদার সম্প্রদায়ের প্রভাবশালী সামাজিক ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ‘সিডসার উমিয়াধাম ট্রাস্ট’-কে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে নামাতে বাধ্য হয়েছে বিজেপি নেতৃত্ব।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, যে পটিদার ভোটব্যাংকের ওপর ভর করে গুজরাটে বিজেপি টিকে আছে, সেই কৃষিজীবী সমাজই আজ সরকারের কর্পোরেট-ঘেঁষা নীতির বিরুদ্ধে রাস্তায় নেমেছে। ভোটের সময় ‘কিষাণ দরদী’ সাজার নাটক করলেও, প্রয়োজনের সময় যে সরকার কৃষকদের স্বার্থ বিকিয়ে দিতে দুবার ভাবে না, মোরবির এই আন্দোলন আরও একবার তা প্রমাণ করে দিল।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *