মেদিনীপুর, নিজস্ব সংবাদদাতা: যাদবপুরে পুনর্বাসন ছাড়া হকার উচ্ছেদকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া বিতর্ক এখন রাজ্যজুড়ে বৃহত্তর রাজনৈতিক ও সামাজিক আন্দোলনের রূপ নিতে শুরু করেছে। হকার, বস্তিবাসী, দিনমজুর, ভ্যানচালক, গুমটির দোকানি থেকে শুরু করে ছাত্র-যুবদের একাংশও ক্রমশ এই আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছেন। বিভিন্ন জেলার প্রতিবাদ কর্মসূচিতে অংশগ্রহণকারীদের সংখ্যা বাড়তে থাকায় রাজনৈতিক মহলেও নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
গত কয়েক সপ্তাহ ধরে রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে হকার উচ্ছেদকে কেন্দ্র করে যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে, তার একটি বড় বহিঃপ্রকাশ দেখা যায় যাদবপুরে। পুনর্বাসনের দাবি নিয়ে আন্দোলনরত হকারদের পাশে দাঁড়াতে গিয়ে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়েন ছাত্র-যুব সংগঠনের কর্মীরা। সেই সময় ভারতের ছাত্র ফেডারেশনের (SFI) সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক সৃজন ভট্টাচার্য গ্রেপ্তার হন। বামপন্থী সংগঠনগুলির অভিযোগ, পুলিশি হস্তক্ষেপে বহু ছাত্র-যুব কর্মী আহত হন।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের একাংশের মতে, সৃজন ভট্টাচার্যের গ্রেপ্তারি এবং ছাত্রদের উপর পুলিশি পদক্ষেপ রাজ্যের ছাত্রসমাজের একাংশের মধ্যে উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলেছে। এর পর থেকেই বিভিন্ন কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্ছেদ বিরোধী পোস্টারিং, প্রতিবাদ সভা, মিছিল এবং বিক্ষোভ কর্মসূচি বাড়তে দেখা যাচ্ছে। মেদিনীপুর কলেজ, বিদ্যাসাগর বিশ্ববিদ্যালয়-সহ একাধিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছাত্রদের সক্রিয় অংশগ্রহণ নজর কেড়েছে। আন্দোলনের সঙ্গে বামপন্থী ছাত্র সংগঠনগুলির সম্পৃক্ততা আগামী দিনে আরও বাড়বে বলেই রাজনৈতিক মহলের ধারণা।
অন্যদিকে পশ্চিম মেদিনীপুরে CITU, UCRC, PBUS, ১২ জুলাই কমিটি, SFI, DYFI-সহ বিভিন্ন বামপন্থী গণসংগঠনের উদ্যোগে মেদিনীপুর শহরে প্রতিবাদ মিছিল ও জেলা শাসকের কাছে ডেপুটেশন দেওয়া হয়েছে। দাবিগুলির মধ্যে রয়েছে পুনর্বাসন ছাড়া হকার ও বস্তি উচ্ছেদ বন্ধ, স্মার্ট মিটার প্রত্যাহার, SIR-এর নামে বাদ পড়া বৈধ ভোটারদের নাম পুনরায় অন্তর্ভুক্তি, ১০০ দিনের কাজ চালু, ছাত্র সংসদ নির্বাচন এবং দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ।
ডেপুটেশনে বাম নেতৃত্বের বক্তব্য, উন্নয়নের নামে গরিব মানুষের জীবিকা কেড়ে নেওয়া যায় না। সুপ্রিম কোর্টের পর্যবেক্ষণ এবং কেন্দ্রীয় আইনের কথা উল্লেখ করে তাঁরা বলেন, বিকল্প পুনর্বাসন ও জীবিকার ব্যবস্থা ছাড়া উচ্ছেদ গণতান্ত্রিক ও মানবিক নীতির পরিপন্থী।
এই আন্দোলনের রাজনৈতিক তাৎপর্যও ক্রমশ স্পষ্ট হচ্ছে। একদিকে দুর্নীতির বিভিন্ন অভিযোগে রাজ্যের একাধিক প্রভাবশালী তৃণমূল নেতা তদন্ত ও গ্রেপ্তারের মুখোমুখি হচ্ছেন। বিভিন্ন এলাকায় জনরোষের ঘটনাও সামনে এসেছে। অন্যদিকে তৃণমূলের কিছু নেতার বিজেপিতে যোগদান এবং বিজেপির অভ্যন্তরে সেই নিয়ে রাজনৈতিক সমীকরণ তৈরির চর্চা চলছে। এই আবহে দীর্ঘদিনের পরিচিত ইস্যু— জীবিকা, পুনর্বাসন, শ্রমজীবী মানুষের অধিকার এবং শিক্ষার প্রশ্ন— নিয়ে বামপন্থীরা আবার মাঠে সক্রিয় হয়ে উঠেছে।
জেলার বিভিন্ন প্রান্তে অনুষ্ঠিত মিছিল ও প্রতিবাদ কর্মসূচিতে অংশগ্রহণকারীদের সামাজিক বিন্যাসও রাজনৈতিক মহলের নজর কেড়েছে। হকার, ভ্যানচালক, দিনমজুর, পরিচারিকা, ক্ষুদ্র দোকানি এবং প্রান্তিক শ্রমজীবী মানুষের উপস্থিতি তুলনামূলকভাবে বেশি দেখা যাচ্ছে। বামপন্থী সংগঠনগুলির দাবি, এই অংশের মানুষ নিজেদের জীবিকা ও অস্তিত্বের প্রশ্নে সরাসরি আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছেন।
মেদিনীপুর, খড়গপুর, ঘাটাল, দাসপুর থেকে শুরু করে জেলার সীমান্তবর্তী এলাকাগুলিতেও প্রতিবাদ কর্মসূচি হয়েছে। অংশগ্রহণকারীদের সংখ্যা ধীরে ধীরে বাড়ছে বলে দাবি সংগঠকদের। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, এই মুহূর্তে বাংলার বিরোধী রাজনীতিতে নতুন সমীকরণ তৈরি হচ্ছে এবং হকার উচ্ছেদ বিরোধী আন্দোলন সেই প্রক্রিয়াকে আরও দৃশ্যমান করে তুলেছে।
আন্দোলনকারী সংগঠনগুলির বক্তব্য, উন্নয়নের নামে উচ্ছেদ নয়, পুনর্বাসন ও জীবিকার নিশ্চয়তা চাই। আর সেই দাবিকে সামনে রেখেই আগামী দিনেও রাজ্যজুড়ে প্রতিবাদ কর্মসূচি আরও বিস্তৃত হবে।