নিজস্ব সংবাদদাতা, ঝাড়গ্রাম: রিসর্টের আমবাগান ঘিরে রাখা বিদ্যুতের খোলা তারে তড়িতাহত হয়ে এক সঙ্গীর মৃত্যুর জেরে হাতির তাণ্ডবে ২ দিনে ২ যুবকের মৃত্যু হল ঝাড়গ্রামে। বুধ এবং বৃহস্পতিবার ঝাড়গ্রামের লোধাশুলি রেঞ্জের গড়শালবনী এলাকার মৃত্যুগুলি হয়।
মঙ্গলবার লোধাশুলি রেঞ্জের গড়শালবনীর বিকাশ ভারতীর পাশে কৌশল্যা হেরিটেজ গেস্ট হাউস ক্যাম্পাসে তড়িতাহত হয়ে মৃত্যু হয় এক পূর্ণ বয়স্ক হাতির। তার পর থেকেই নাকি ঝাড়গ্রামের এলিনা এলাকায় একটি লেজকাটা পূর্ণবয়স্ক হাতি কার্যত পাগলের মতো মানুষের গন্ধ পেলেই তেড়ে গিয়ে আক্রমণ করছে। তাণ্ডব চালাচ্ছে এলাকায়।
বুধবার লোধাশুলি রেঞ্জের পূর্ণাপানি জঙ্গলের রাস্তায় হাতির আক্রমণের মুখে পড়েন ঝাড়গ্রাম থানার আসনবনি গ্রামের এক যুবক। এলাকার একটি মাঠে ক্রিকেট খেলে বাড়ি ফিরছিল বছর উনিশের নীতীশ মাহাতো নামে ওই যুবক। ফেরার পথে হাতির আক্রমণে গুরুতর আহত হন তিনি। উদ্ধার করে তাঁকে ঝাড়গ্রাম হাসপাতালে ভর্তি করা হলেও শেষ পর্যন্ত বাঁচানো যায়নি। বুধবার রাতেই তাঁর মৃত্যু হয়।
পরের দিন, বৃহস্পতিবার, ওই এলাকাতেই চাষের জমিতে কাজ করতে আসে এলিনা গ্রামের একটি পরিবার। তাঁরা গাছের তলায় বসে খাবার খাচ্ছিলেন। সেই সময় হঠাৎ একটি দাঁতাল বনের ভিতরের রাস্তা দিয়ে যাওয়া লোকজনকে দেখে তাড়া করতে শুরু করে। কেউ কিছু বুঝে ওঠার আগেই গাছের তলায় বসে থাকা ওই পরিবারের যুবক মঙ্গল মুর্মুকে আক্রমণ করে হাতিটি। শুধু আক্রমণই নয়, তাঁকে দাঁতে তুলে নিয়ে বেশ কিছুটা দূরে চলে যায়। পরে জঙ্গলের অপর প্রান্ত থেকে মঙ্গলের দেহ উদ্ধার হয়।
বন দফতরের জমিতে বনাঞ্চল ধ্বংস করে এলাকায় একের পর এক রিসর্ট ও হোমস্টে গড়ে উঠেছে বলে অভিযোগ। গড়শালবনীর বিকাশ ভারতীর পাশে কৌশল্যা হেরিটেজ গেস্ট হাউস চত্বরে সম্পত্তি রক্ষার জন্য খোলা বিদ্যুতের তার দিয়ে ঘেরা হয়েছিল বলে জানা গিয়েছে। সেই তারেই পা দিয়ে একটি পূর্ণবয়স্ক হাতির মৃত্যু হয় মঙ্গলবার সকালে।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছে বন দফতরের কর্মীরা। তারা হাতির পালটিকে জঙ্গলের ভিতরের দিকে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছেন। তবে এখনও তীব্র আতঙ্কে রয়েছেন এলাকার মানুষ।
জঙ্গল ধ্বংস করে ঘরবাড়ি তৈরি এবং ওড়িশা ও পশ্চিমবঙ্গের পাহাড় কেটে ফেলার ফলে হাতিদের স্বাভাবিক চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। ফলে তাদের করিডরও পরিবর্তিত হয়ে যাচ্ছে। এমনকি ওড়িশার হাতিও ঢুকে পড়ছে ঝাড়গ্রামের বিভিন্ন এলাকায়। ঢুকে পড়ার পর আবার ফিরে যেতে সমস্যায় পড়ছে তারা, কারণ করিডর বদলে গিয়েছে। জঙ্গলমহলে এখন হাতির সংখ্যা প্রায় ৪০০ বলে জানা গিয়েছে। খাবারের খোঁজে তারা বন থেকে বেরিয়ে চাষের জমি, এমনকি লোকালয়েও ঢুকে পড়ছে আম কাঁঠাল কাজু কলার টানে। ফলে প্রতিদিনই প্রাণসংশয়ের মুখে পড়ছেন সাধারণ মানুষ।
বন্যপ্রাণ বিশেষজ্ঞদের মতে, যত দিন না হাতিদের বেঁচে থাকার জন্য পর্যাপ্ত বনাঞ্চল গড়ে তোলা হচ্ছে এবং যাতায়াতের জন্য নিরাপদ করিডর তৈরি করা যাচ্ছে, তত দিন লোকালয়ে হাতির হানা বাড়তেই থাকবে। ব্যবসায়িক স্বার্থে বনাঞ্চল ও পাহাড় ধ্বংস বন্ধ না হলে প্রান্তিক বনবাসী মানুষদের এ ভাবেই ভুগতে হবে বলেও মত বিশেষজ্ঞদের।