এক গাড়ি বালিতে মানুষের পকেট থেকে কত টাকা চুরি, হিসাব দিলেন সিটু নেতা!

নিজস্ব প্রতিবেদন, মেদিনীপুর: পশ্চিম মেদিনীপুর নির্মাণ কর্মী ইউনিয়নের একাধিক দাবিদাওয়া নিয়ে মেদিনীপুরে জেলা ভূমি ও ভূমি সংস্কার আধিকারিকের কাছে ডেপুটেশন দিতে গিয়ে চাঞ্চল্যকর দাবি করলেন বামপন্থী শ্রমিক সংগঠন সিটুর জেলা সম্পাদক গোপাল প্রামাণিক। তাঁর দাবি, বালির সরকার নির্ধারিত দাম এবং সাধারণ মানুষের কাছ থেকে যে টাকা নেওয়া হচ্ছে, তার মধ্যে আকাশ-পাতাল তফাত। প্রতিদিন একটি করে খাদান থেকে কয়েক লক্ষ থেকে কোটি টাকা অবৈধ ভাবে তোলা হচ্ছে।

গোপাল প্রামাণিক জানিয়েছেন, এক সিএফটি (১ ঘনফুট) বালির সরকার নির্ধারিত রয়্যালটি ৩ টাকা ২ পয়সা। এর সঙ্গে সরকারি সেস ১৫ পয়সা। অর্থাৎ খাদানে এক সিএফটি বালির দাম দাঁড়ায় ৩ টাকা ১৭ পয়সা। একটি ট্রাক্টরে প্রায় ১০০ সিএফটি বালি ধরে। এই পরিমাণ বালির দাম হিসাব মতো ৩১৭ টাকা।

এর সঙ্গে যোগ হবে পরিবহণ ও অন্যান্য খরচ। দূরত্বের উপর নির্ভর করে যা কিছুটা হেরফের হলেও এক থেকে দেড় হাজার টাকা পর্যন্ত হতে পারে। ব্যবসায়ীর লাভ গাড়ি প্রতি ৫০০ টাকা ধরা হলেও ১০০ সিএফটি বালির মূল্য দাঁড়ায় ২,৩১৭ টাকা। হিসাবের সুবিধার জন্য তা ২,৫০০ টাকা প্রতি ১০০ সিএফটি ধরে নেওয়া যেতে পারে। তাহলেও সেই বালি ক্রেতার কাছে পৌঁছয় প্রায় ১০ থেকে ১১ হাজার টাকা প্রতি গাড়ি হিসাবে।

সেখানেও আবার গোলমাল রয়েছে বলে অভিযোগ, একটি ট্রাক্টরে ১০০ সিএফটি বালি থাকার কথা থাকলেও বাস্তবে তা থাকে প্রায় ৮০ সিএফটি। অর্থাৎ এই পরিমাণ বালির দাম যেখানে ২,০০০ থেকে ২,৫০০ টাকা হওয়ার কথা, সেখানে গ্রাহককে প্রায় ৮-৯ হাজার টাকা বেশি দিয়ে কিনতে হচ্ছে বলে দাবি সিটু নেতার।

পশ্চিম মেদিনীপুরের দাঁতন-১ ব্লকের বড়া-১ নম্বর অঞ্চলের বালি খাদান থেকে এখন দিনে ৭০০-৮০০ গাড়ি বালি ওঠে। ফলে প্রতি গাড়িতে যদি ৮ হাজার টাকা অতিরিক্ত তোলা হয়, তবে সারা দিনে একটি মাত্র খাদান থেকে প্রায় ৬০-৬৫ লক্ষ টাকা চুরি হচ্ছে জনগণের পকেট থেকে—এমনই দাবি গোপাল প্রামাণিকের।

গোপাল প্রামাণিক প্রশ্ন তুলেছেন, এই অতিরিক্ত টাকা যাচ্ছে কার পকেটে? তাঁর অভিযোগ, আগের সরকারের আমলে তৃণমূলের নেতারা এই টাকা নিজেদের পকেটে পুরতেন, এখন বিজেপি নেতারা একই ভাবে মানুষকে লুটছেন। তাঁর আরও অভিযোগ, জনগণের পকেট থেকে চুরি করা এই টাকা নিচু স্তর থেকে একেবারে উপর স্তর পর্যন্ত পৌঁছে যাচ্ছে।

এর ফলে শুধু যে ঘরবাড়ি করতে চাওয়া সাধারণ মানুষ সমস্যায় পড়ছেন, তা নয়, সমস্যায় পড়ছেন নির্মাণশিল্পের সঙ্গে যুক্ত শ্রমিকেরাও। বালির অতিরিক্ত দামের কারণে নানা জায়গায় থমকে যাচ্ছে নির্মাণকাজ। রুজি হারাচ্ছেন শ্রমিকেরা। এমনকি সরকারি প্রকল্পে যাঁরা বাড়ি তৈরির জন্য টাকা পেয়েছেন, তাঁরাও বালির মতো প্রাকৃতিক সম্পদ, যা কার্যত নদী থেকে জলের দরে তোলা যায়, তার আকাশছোঁয়া দামের কারণে বাড়ি তৈরির কাজে হাত দিতে পারছেন না বলে দাবি।

সম্প্রতি মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী বালির দাম নিয়ন্ত্রণ করার কথা বলেছেন। এমনকি পুজোর পর বন্ধ খাদান খুলে দেওয়ার কথাও বলেছেন। তাঁর দাবি, এর ফলে বালির দাম কমবে। অর্থাৎ বালির অতিরিক্ত দামের কথা তিনিও জানেন। কিন্তু এই চুরি কতটা নিয়ন্ত্রণ হবে, তা সময়ই বলবে।

বালির অতিরিক্ত দাম ও নির্মাণ শ্রমিকদের স্বার্থের কথা ভেবে দীর্ঘ দিন ধরেই লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে বামপন্থী শ্রমিক সংগঠন সিটু। গত ২৩ সেপ্টেম্বর তারা মেদিনীপুরে জেলা ভূমি ও ভূমি সংস্কার আধিকারিকের কাছে বিস্তারিত অভিযোগ জানিয়ে ডেপুটেশন দেয়।

গোপাল প্রামাণিক জানিয়েছেন, আধিকারিক তাঁকে জানিয়েছেন, এক মাসের মধ্যে তিনি বিষয়গুলি দেখবেন এবং সরকারের কাছে ডেপুটেশনের কপি পাঠিয়ে গোটা বিষয়টি জানাবেন।

এই ডেপুটেশনে গোপাল প্রামাণিক ছাড়াও ছিলেন সিটু নেতৃত্ব কমল পলমল, শ্রীকৃষ্ণ শীল, সবুজ ঘোড়াই, চন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়, অশোক জানা, অতনু মাইতি, সিদ্ধার্থ পাণ্ডা, অমল ঘোড়াই, কাসেম আলি, মানস মিত্র, দিলীপ দে, শ্যামল পাল, ভবানন্দ জানা, শেখ আসলাম, আশিস সরকার, প্রদীপ বাকলী, তপন পাল, শুভঙ্কর ব্যানার্জী সহ অন্যান্য নেতৃত্ব।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *