সরকারি বিজ্ঞাপনে দুর্গার ১১ হাত! ‘হিন্দুত্বের’ ধ্বজাধারী বিজেপি সরকার ধরাশায়ী শতরূপের কটাক্ষ বানে

নিজস্ব সংবাদদাতা, কলকাতা: দুর্গাপুজো নিয়ে বাঙালিকে নীতি-নির্দেশ দেওয়ার তৎপরতা। পুজোর আয়োজন থেকে খাবার—কী করা যাবে, কী যাবে না, তা নিয়ে একের পর এক বার্তা। আর সেই আবহেই সরকারি বিজ্ঞাপনে দেবী দুর্গার ছবিতে দশের বদলে ১১টি হাত! বিজেপি-শাসিত রাজ্য সরকারের এমন ‘ভুল’ ঘিরে শুরু হয়েছে তীব্র রাজনৈতিক কটাক্ষ।

দুর্গাপুজো উপলক্ষে রাজ্যের তথ্য ও সংস্কৃতি দফতরের প্রকাশিত বিজ্ঞাপনে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এবং মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর ছবি রয়েছে। বিজ্ঞাপনের মূল বিষয় হিসেবে রাখা হয়েছে দেবী দুর্গার একটি ছবি। কিন্তু সেখানেই চোখে পড়েছে অস্বাভাবিকতা—দশভুজার বদলে একাদশভুজা দুর্গা! বিজ্ঞাপনটি প্রকাশ্যে আসার পর সমাজমাধ্যমে শুরু হয় তীব্র সমালোচনা ও ব্যঙ্গ।

‘এক্সট্রা হাত’ নিয়েই শতরূপের কটাক্ষ

বিষয়টি নিয়ে সরাসরি বিজেপি সরকারকে নিশানা করেছেন সিপিএম নেতা শতরূপ ঘোষ। বিজ্ঞাপনের ছবি তুলে ধরে তাঁর বক্তব্য, ‘একটা চমৎকার সরকারী বিজ্ঞাপন! এখানে মা দুর্গার এগারোটা হাত। দেবতাদের পক্ষ থেকে দুর্গাকে দশ হাতে অস্ত্র দেওয়া হয়েছিল অসুর বধের জন্য। আর বিজেপি সরকারের পক্ষ থেকে ঠাকুরকে একটা এক্সট্রা হাত দেওয়া হয়েছে, পুজোর সময় বাঙালির ওপর কেউ নিরামিষ খাওয়ার ফতোয়া জারি করতে এলে তাকে কানের গোড়ায় থাবড়া মেরে প্যাণ্ডেল এবং বাঙলা থেকে বের করে দেওয়ার জন্য।’

সোমবার মিলনমেলা প্রাঙ্গণে দুর্গাপুজো কমিটিগুলির সঙ্গে বৈঠকের পরে মুখ্যমন্ত্রী তাঁর বক্তৃতার শুরুতে বিষয়টি তোলেন। তিনি বলেন, ‘‘আজকের একটা ত্রুটিপূর্ণ বিজ্ঞাপন বেরিয়েছিল। রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে এর জন্য ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি।’’ একই সঙ্গে জানান, যাঁরা এই বিজ্ঞাপনের দায়িত্বে ছিলেন, তাঁদের ইতিমধ্যেই সতর্ক করা হয়েছে। পাশাপাশি, এই সব ক্ষেত্রে ভবিষ্যতে সরকার আরও যত্নবান হবে বলেও বাড়ি করেন মুখ্যমন্ত্রী।

তবে শতরূপের এই শ্লেষাত্মক মন্তব্য ঘিরে সমাজমাধ্যমেও শুরু হয়েছে বিস্তর চর্চা। প্রশ্ন উঠেছে, যে রাজনৈতিক শিবির নিজেদের হিন্দু ধর্ম ও সংস্কৃতির রক্ষক বলে তুলে ধরে, তাদের সরকারের সরকারি বিজ্ঞাপনেই যদি দেবীর প্রচলিত রূপ বিকৃত হয়ে যায়, তবে সেই ‘ধর্মীয় সতর্কতা’র দায় কার?

‘মা আরও শক্তিশালী হয়েছেন’, প্রথমে সাফাই বিজেপির

বিতর্কের মধ্যে বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য প্রথমে বলেন, ‘‘মা দুর্গা আরও শক্তিশালী হয়ে গিয়েছেন।’’ পরে তিনি জানান, বিজ্ঞাপনটি তিনি দেখেননি; কোনও বিজ্ঞাপন সংস্থার ভুল হয়ে থাকতে পারে এবং তা সংশোধন করা হবে।

তবে বিষয়টি স্রেফ ‘ছাপার ভুল’ বলে পাশ কাটানো যায় কি না, তা নিয়েই প্রশ্ন তুলছেন বিরোধীরা। কারণ, বিজ্ঞাপনটি কোনও সাধারণ প্রচারপত্র নয়—দুর্গাপুজো সংক্রান্ত সরকারি কর্মসূচির প্রচারেই রাজ্যের তথ্য ও সংস্কৃতি দফতরের বিজ্ঞাপন। ফলে তার বিষয়বস্তু ও ছবি যাচাইয়ের ন্যূনতম দায়িত্বও সরকারেরই, এমনটাই বিরোধীদের বক্তব্য।

তবে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে—ধর্মীয় আবেগ ও সংস্কৃতির প্রশ্নে সাধারণ মানুষকে বার্তা দেওয়ার আগে নিজেদের সরকারি বিজ্ঞাপনটিই কি আরও এক বার দেখে নেওয়া যেত না? দেবী দুর্গার প্রচলিত রূপ নিয়েই যখন এমন অসতর্কতা, তখন ‘সংস্কৃতি রক্ষার’ দাবির বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়েই নতুন করে প্রশ্ন তুলছে এই ঘটনা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *