মধ্যপ্রাচ্যে ইরান–আমেরিকা ও ইজরায়েল সংঘাতের জেরে আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি ক্রমেই অস্থির হয়ে উঠছে। এই উত্তেজনার কেন্দ্রে রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ হর্মুজ প্রণালী। বিশ্বে প্রায় ৪০ শতাংশ অপরিশোধিত তেল এই পথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। ভারতের আমদানিকৃত তেলেরও বড় অংশ এই প্রণালীর উপর নির্ভরশীল।সাম্প্রতিক পরিস্থিতিতে ইরান স্পষ্ট হুঁশিয়ারি দিয়েছে—রাশিয়া ও চীনের জাহাজ ছাড়া অন্য দেশের তেলবাহী জাহাজ চলাচলে বাধা দেওয়া হতে পারে। অর্থাৎ রাশিয়া ও চীন-কে কার্যত ছাড় দিয়ে বাকি দেশগুলির জন্য কঠোর অবস্থান। এই ঘোষণার ফলে ভারতসহ বহু তেল-নির্ভর অর্থনীতি গভীর অনিশ্চয়তায় পড়েছে। যা প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর নেতৃত্বে এই বিজেপি সরকারের ব্যর্থ বিদেশনীতিকে আরও একবার প্রকাশ্যে নিয়ে এল।
ভারতের ক্ষেত্রে বিষয়টি অত্যন্ত সংবেদনশীল। তেল সরবরাহ ব্যাহত হলে আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়বে। তার সরাসরি প্রভাব পড়বে দেশের পেট্রোল–ডিজেল ও রান্নার গ্যাসের মূল্যে। পরিবহণ ব্যয় বাড়লে খাদ্যদ্রব্য, ওষুধ, নির্মাণসামগ্রীসহ নিত্য প্রয়োজনীয় প্রায় সব কিছুর দামই ঊর্ধ্বমুখী হবে। মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত পরিবারের মাসিক বাজেটে বড় ধাক্কা লাগতে পারে।
এই জটিল সময়ে ভারতের কূটনৈতিক অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন আরও তীব্র হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী-র নেতৃত্বে গত এক দশকে দেশের বিদেশনীতি নিয়ে সরকার বারবার আত্মপ্রশংসা করলেও বাস্তবে প্রতিবেশী দেশগুলির সঙ্গে সম্পর্কের টানাপোড়েন, পশ্চিমি শক্তির প্রতি অতিরিক্ত নির্ভরতা এবং কৌশলগত ভারসাম্য রক্ষায় ব্যর্থতার অভিযোগ উঠেছে। একদিকে আমেরিকার সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়ানো, অন্যদিকে ইরান-সহ পশ্চিম এশিয়ার গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি অংশীদারদের সঙ্গে সম্পর্কের সূক্ষ্ম ভারসাম্য রক্ষা—এই দ্বৈত কৌশলে সরকারের অদূরদর্শিতা আজ প্রকট হয়ে উঠছে বলে বিরোধীদের দাবি।বিশেষজ্ঞ মহলের একাংশের মত, রাশিয়া ও চীন কৌশলগতভাবে নিজেদের অবস্থান শক্ত করেছে, অথচ ভারত কার্যত ‘মাঝখানে আটকে’ পড়েছে। একদিকে পশ্চিমি চাপ, অন্যদিকে জ্বালানি নিরাপত্তার বাস্তবতা—এই দুইয়ের টানাপোড়েনে ভারতের অবস্থান এখন শাঁখের করাতের মতো। কোনো এক পক্ষের প্রতি প্রকাশ্য ঝোঁক দেখালেই অর্থনৈতিক বা কূটনৈতিক মূল্য চোকাতে হতে পারে।
তার উপর ডলারের তুলনায় টাকার দরপতন আমদানি ব্যয় আরও বাড়িয়ে তুলছে। ব্যবসায়ী মহল ইতিমধ্যেই উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত হলে মূল্যবৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণ করা সরকারের পক্ষে কঠিন হয়ে পড়বে বলেই আশঙ্কা।
সব মিলিয়ে হর্মুজ প্রণালী ঘিরে এই আন্তর্জাতিক সংকট শুধু একটি ভূরাজনৈতিক ঘটনা নয়, এটি ভারতের অর্থনীতি, বাজার এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার উপর সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারে। এখন প্রশ্ন একটাই—মোদী সরকার কি কূটনৈতিক দক্ষতা ও অর্থনৈতিক প্রস্তুতি দিয়ে এই সংকট সামাল দিতে পারবে, নাকি বিদেশনীতির সীমাবদ্ধতাই আরও প্রকট হয়ে উঠবে?