আইআইটিগুলিতে একের পর এক মৃত্যু! প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতার করুণ ছবি সামনে এলেও কেন্দ্র কেন নীরব?

দেশের সর্বোচ্চ প্রযুক্তি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আইআইটিগুলি। তাদের অন্যতম আইআইটি কানপুর ও খড়গপুর। ‘মেধার আঁতুড়ঘর’ হিসেবে পরিচিত এই প্রতিষ্ঠানগুলিতে গত দু’বছরে পরপর বেশ কয়েক জন পড়ুয়ার আত্মহত্যা বা মৃত্যুর ঘটনা সামনে এসেছে। শুধু আইআইটি কানপুরেই গত দু’বছরে ৯ জন পড়ুয়া ও গবেষকের আত্মহত্যার ঘটনা সামনে এসেছে। তথ্য বলছে, ২০২৩ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২৬ সালের জানুয়ারির মধ্যে একের পর এক তরুণ প্রাণ ঝরে গিয়েছে—যা নিঃসন্দেহে প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতার ভয়াবহ দলিল।

১৯ ডিসেম্বর ২০২৩-এ গবেষণা সহকারী (স্টাফ) ডঃ পল্লবী চিলকার মৃত্যুর মধ্য দিয়ে শুরু। তার পর ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে মাত্র ৮ দিনের ব্যবধানে মৃত্যু হয় এমটেক পড়ুয়া বিকাশ মীনা এবং পিএইচডি গবেষক প্রিয়াঙ্কা জয়সওয়ালের। ২০২৪ সালের অক্টোবরে প্রাণ হারান আরও এক পিএইচডি স্কলার প্রগতি।

২০২৫ সালেও থামেনি এই মৃত্যুমিছিল—ফেব্রুয়ারিতে অঙ্কিত যাদব, অগস্টে দীপক চৌধুরী, অক্টোবরে চূড়ান্ত বর্ষের বিটেক পড়ুয়া ধীরজ সাইনি এবং ডিসেম্বরে জয়সিংহ মীনা। সর্বশেষ ২০২৬ সালের ২০ জানুয়ারি আত্মহত্যা করেন পিএইচডি গবেষক স্বরূপ ঈশ্বরম।

খড়গপুর আইআইটির ক্ষেত্রেও তালিকাটি ছোট নয়। আইআইটি খড়গপুরের বায়োটেকনোলজি ও বায়োকেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের মেধাবী চতুর্থ বর্ষের ছাত্রী দেবিকা পিল্লাই (২১) ২০২৪ সালের জুন মাসে ক্যাম্পাসের হোস্টেলে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়। কেরালার বাসিন্দা দেবিকা সারোজিনী নাইডু / ইন্দিরা গান্ধী হলের জেনারেল সেক্রেটারি ছিলেন।

২০২৫ সালের জানুয়ারিতে ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ছাত্র শাওন মালিকের মৃত্যুর ঘটনা সামনে আসে। হোস্টেল রুমে ঝুলন্ত অবস্থায় তাঁর দেহ উদ্ধার হয়। এপ্রিলে চতুর্থ বর্ষের (ডুয়াল ডিগ্রি) ছাত্র অনিকেত ওয়ালকরের অস্বাভাবিক মৃত্যু হয় হোস্টেল রুমে। মে মাসে তৃতীয় বর্ষের সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ছাত্র মহম্মদ আসিফ কামারের দেহ হোস্টেল রুমে ঝুলন্ত অবস্থায় উদ্ধার হয়। জুলাই মাসে মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ছাত্র ঋতম মণ্ডলের দেহও হোস্টেল রুমে ঝুলন্ত অবস্থায় উদ্ধার হয়। একই মাসে আরও একটি মৃত্যুর ঘটনা সামনে আসে। দ্বিতীয় বর্ষের ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ছাত্র চন্দ্রদীপ পাওয়ারের মৃত্যু হয়। মৃত্যুর কারণ হিসেবে দুর্ঘটনার কথা জানানো হয়। বলা হয়, ওষুধ গলায় আটকে অসুস্থ হয়ে পড়ার পর তাঁর মৃত্যু হয়েছিল।

এই ঘটনাগুলি নিছক বিচ্ছিন্ন নয়। বরং এক গভীর কাঠামোগত সংকটের ইঙ্গিত দিচ্ছে—এমনটাই মত শিক্ষা মহলের একাংশের। পশ্চিম মেদিনীপুরের প্রাক্তন ছাত্রনেতৃত্ব, বর্তমানে সিপিআইএম জেলা সম্পাদক বিজয় পাল প্রশ্ন তুলেছেন, আইআইটির মতো প্রতিষ্ঠানে এত ধারাবাহিক মৃত্যুর জন্য দায়ী কে? কাউকে না কাউকে তো এই সব প্রতিভাবান ছাত্রদের মৃত্যুর দায় নিতে হবে। কেন পড়ুয়াদের জন্য কার্যকর মানসিক স্বাস্থ্য পরিকাঠামো গড়ে তোলা যাচ্ছে না? কেন পড়ুয়াদের উপর বাড়তে থাকা অ্যাকাডেমিক চাপ, বৈষম্য, সামাজিক নিঃসঙ্গতা বা প্রশাসনিক উদাসীনতা নিয়ে কেন্দ্রীয় সরকার কোনও দায় নিচ্ছে না?

বিজয় পাল আরও বলেন, বিজেপি-নেতৃত্বাধীন কেন্দ্রীয় সরকার টাকা খরচ করে ‘নিউ ইন্ডিয়া’, ‘বিশ্বগুরু’ এবং ‘ডিজিটাল ভারতের’ ঢাক পেটালেও বাস্তবে দেশের সেরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলিতেই পড়ুয়াদের জীবন সুরক্ষিত নয়। বিজ্ঞাপনে টাকা খরচ হলেও শিক্ষা খাতে বাজেট ছাঁটাই, ফেলোশিপের অনিশ্চয়তা, গবেষণায় কর্পোরেট নির্ভরতা এবং প্রশাসনিক স্বেচ্ছাচার—সব মিলিয়ে পড়ুয়াদের উপর মানসিক চাপ ক্রমেই বাড়ছে।

তিনি আরও যোগ করেন, সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয়, এত মৃত্যুর পরেও কোনও সর্বভারতীয় স্বাধীন তদন্ত, সংসদীয় আলোচনা বা দায়স্বীকার দেখা যায়নি। প্রতিবারই ‘ব্যক্তিগত কারণ’ বলে দায় ঝেড়ে ফেলা হয়েছে। কিন্তু একের পর এক তরুণ প্রাণ হারানো কি শুধুই ব্যক্তিগত? আইআইটিগুলিতে এই আত্মহত্যাগুলি আসলে দেশের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থার গভীর অসুখের প্রতিফলন। প্রশ্ন একটাই—আর কত প্রাণ গেলে তবে ঘুম ভাঙবে কেন্দ্রের?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *