নিজস্ব সংবাদদাতা, পুরুলিয়া, ৯ ডিসেম্বর: এমন অমানবিক দৃশ্য মনে হয় এ রাজ্যের মানুষের চোখ সওয়া হয়ে গিয়েছে। না হলে ভোর থেকে পুরুলিয়ার জেলাশাসকের দফতরের সামনে ছোট ছোট ছেলে মেয়েগুলো না খেয়ে জলের অভাবে যখন জ্ঞান হারাচ্ছিল তখন প্রশাসনের কেউ একটা জানালার ফাঁক দিয়ে একবার উঁকি মেরেও দেখল না? এ কেমন প্রশাসন, প্রশ্ন তুলছেন শিক্ষকের দাবিতে শিক্ষার দাবিতে জেলাশাসকের সঙ্গে দেখা করতে আসা ছাত্রছাত্রীদের বাবা মায়েরা।
সোমবার ভোর থেকেই পুরুলিয়া জেলা প্রশাসনের প্রধান দফতরের সামনে জড়ো হতে শুরু করেছিলেন সাঁওতালি মাধ্যমের স্কুলের ছাত্রছাত্রী, তাদের অভিভাবক ও শিক্ষকরা। কেউ হাত ধরাধরি করে দাঁড়িয়ে, কেউ কাঁধে ব্যাগ চেপে, কেউ আবার কোলের শিশুকে আঁকড়ে—সবার উদ্দেশ্য একটাই, সাঁওতালি স্কুলে শিক্ষক-ঘাটতি ও পাঠ্যপুস্তকের অভাবের কথা দায়িত্বশীল কর্তাদের জানানো। কিন্তু অভিযোগ জানানোর মতো কাউকে পাওয়া গেল কোথায়!
সকাল থেকে সন্ধে—অপেক্ষা শুধু দীর্ঘই নয়, অসহনীয়
সময় গড়াল। দুপুর পেরোল। রোদ নরম হল কিন্তু ক্লান্তির বোঝা বাড়ল ছোট ছোট শিক্ষার্থীদের শরীরে। বহু ঘণ্টা পরেও প্রশাসন থেকে কেউ হাজির হলেন না। এক শিক্ষক ক্ষোভে বললেন, “এতক্ষণ ধরে দাঁড়িয়ে আছি। একটা জানলার পর্দাও তো সরল না!”
সন্ধে নামতেই পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে। ক্ষুদা তৃষ্ণা আর অবসাদে একের পর এক ছাত্রছাত্রী মাথা ঘুরে বসে পড়ছে। কিছু বাচ্চা অজ্ঞান পর্যন্ত হয়ে যায়। অভিভাবকদের মধ্যে হাহাকার শুরু হয়। কিন্তু জল? চিকিৎসা? প্রশাসনের কোনও প্রতিনিধি?—কিছুই আসেনি।
অভিভাবকদের দীর্ঘশ্বাস: ‘আমরা কি শিক্ষা শিক্ষক চেয়ে দোষ করলাম?’
রোদে দাঁড়িয়ে থাকা মায়েদের কারও চোখ ভেজা, কারও শিশুর হাত ঠান্ডা হয়ে এসেছে। এক সাঁওতাল মা চোখের জল সামলাতে না পেরে বললেন, “শিক্ষার দাবি জানাতে এলে এভাবে দাঁড় করিয়ে রাখবে? আমরা কি তবে এই দেশের মানুষ নই?”
পাশেই দাঁড়ানো এক শিক্ষক বললেন, “বছরের পর বছর বলে আসছি। কিন্তু আজ যে অপমান দেখলাম, এর আগে কখনও পাইনি।” সাঁওতালি মাধ্যমের স্কুলে শিক্ষক ও শিক্ষাসামগ্রীর অভাব নিয়ে অভিযোগ পুরুলিয়ার আদিবাসী অঞ্চলে নতুন নয়। সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনার পর মানুষ ক্ষুব্ধ ছিলেন। সেই ক্ষোভই তাঁদের জেলা প্রশাসনের দোরগোড়ায় এনে ফেলেছে।
মানবিকতার নির্বাসন—এ দৃশ্য তারই প্রমাণ
ক্লান্ত মেয়ের মাথায় জল দিচ্ছেন শিক্ষক অভিভাবক। এক বাবা অজ্ঞান হয়ে পড়া ছেলেকে কোলে তুলে ধরে আছেন। পাশেই এক বৃদ্ধ ঠাকুমার কান্না থামছে না। এ দৃশ্য কেবল প্রতিবাদের নয়—এটি মানবিকতার লজ্জাজনক ব্যর্থতার ছবি। প্রশ্ন উঠছে—যে জেলা প্রশাসক উন্নয়নের রিপোর্ট জমা দেন নিত্যদিন, তাঁর দফতরের সামনে অজ্ঞান হয়ে পড়া শিশুদের দিকে একবার তাকানোরও অবকাশ ছিল না?
“আমরা কি দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক?”—সাঁওতালদের বেদনা
অভিভাবকদের মুখে একই প্রশ্ন—সাঁওতালদের দাবি কি এতটাই তুচ্ছ? এক ক্ষুব্ধ অভিভাবক বললেন, “কাগজে উন্নয়ন লিখলেই কি সব হয়ে যায়? আমাদের বাচ্চাদের দুরবস্থা কি কেউ দেখে না?” সরকারি মঞ্চে ‘আদিবাসী উন্নয়ন’ যতই উচ্চারিত হোক, বাস্তবে তার প্রতিফলন যে কতটা দূর, সোমবারের ঘটনাই তা বুঝিয়ে দিল।
এই অমানবিকতার দায় নেবে কে?
ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা, তীব্র ক্লান্তি, খাদ্যের অভাব—অবশেষে শিশুদের অজ্ঞান হয়ে পড়া—সব মিলিয়ে প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন আরও তীব্র হয়েছে। পুরুলিয়ার এই দিনটি তাই জেলা প্রশাসনের খাতায় রয়ে গেল এক কালো কলঙ্ক হয়ে। আজকের ঘটনাই জানিয়ে দিল—এ সংগ্রাম কেবল একটি স্কুলের নয়, এটি শিক্ষার অধিকার, মানবিক মর্যাদা এবং একটি সম্প্রদায়ের স্বীকৃতির লড়াই। আর সেই লড়াই কোনও দরজার সামনে আটকে থাকার নয়—তার বহমানতা আরও জোরালো হল।