ভারত–বাংলাদেশ সম্পর্ক এবং গোটা উপমহাদেশের রাজনীতিতে নতুন অনিশ্চয়তার জন্ম দিল সোমবারের রায়। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রায়ে মানবতাবিরোধী অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হয়ে মৃত্যুদণ্ড ঘোষণার পর প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রথম প্রতিক্রিয়ায় তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।
দিল্লিতে অবস্থান করা হাসিনা এক অডিও বার্তায় বলেছেন, “এই রায় রাজনৈতিকভাবে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত, পক্ষপাতদুষ্ট আদালতের সিদ্ধান্ত। আমার ভাগ্য আল্লাহ ঠিক করবেন, কোনও স্বেচ্ছাচারী ট্রাইব্যুনাল নয়।” তিনি আরও ইঙ্গিত দেন, চাইলে মামলাটি আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে পাঠানো হোক—সেখানে “সত্যিকারের বিচার” সম্ভব।
অন্য দিকে, কূটনৈতিক চাপের কেন্দ্রবিন্দুতে দাঁড়িয়ে ভারত জানিয়েছে, তারা পরিস্থিতির উপর “ঘনিষ্ঠ নজর রাখছে।” ভারতের বিদেশ মন্ত্রণালয় বলেছে, বাংলাদেশের শান্তি, স্থিতিশীলতা ও গণতান্ত্রিক অগ্রগতি ভারতের “মুখ্য স্বার্থ।” একই সঙ্গে তারা জানিয়েছে, ঢাকা থেকে হাসিনা ও তাঁর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালকে প্রত্যর্পণের অনুরোধ এলেও বিষয়টি “আইনি ওরাজনৈতিক দুই দিক থেকেই অত্যন্ত সংবেদনশীল”—সুতরাং সিদ্ধান্ত খুব সতর্কতার সঙ্গে নেওয়া হবে। ভারতের অবস্থান পরিষ্কার: তারা কোনও পক্ষ নিচ্ছে না, কিন্তু কূটনৈতিক ‘ব্যালান্স’ রক্ষা করাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
সোমবার পুনর্গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল ঘোষণা করে, গণ-অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন হাসিনা ও তাঁর তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল। দু’জনেরই শাস্তি মৃত্যুদণ্ড। প্রাক্তন আইজি চৌধুরী আবদুল্লা আল মামুন পেয়েছেন পাঁচ বছরের কারাদণ্ড। চার মাসের শুনানির পর ঘোষিত এই প্রথম ধাপের রায় বলে দিল—রাষ্ট্রক্ষমতার সর্বোচ্চ আসনেও কেউ আইনের ঊর্ধ্বে নন।
কিন্তু এখানেই আইনি পথ শেষ নয়। রায়ের পর উত্তপ্ত ঢাকা—যেখানে ট্রাইব্যুনালের বাইরে অতিরিক্ত নিরাপত্তা, শহরজুড়ে টহল, এবং আওয়ামী লীগ সমর্থকদের বিচ্ছিন্ন প্রতিবাদ দেখা গেছে। অন্য দিকে অন্তর্বর্তী সরকারের কর্মকর্তারা বলছেন, “বিচার প্রক্রিয়াকে আড়াল করার কোনও সুযোগ নেই—দোষীদের শাস্তি হওয়ার মধ্যেই আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়।”
তার পরেও প্রশ্ন রয়ে যায়—এই শাস্তি কার্যকর হতে হলে আরও কয়েকটি ধাপ পার করতে হবে। প্রথম ধাপ আপিল, কিন্তু সেটির শর্তই হল আত্মসমর্পণ। বিদেশে অবস্থান করা হাসিনা ও কামাল আত্মসমর্পণ না করলে আপিল করার অধিকারও পাবেন না। মামুন অবশ্য কারাগারে আছেন, তাই তাঁর জন্য আপিলের পথ খোলা। দ্বিতীয় ধাপ রিভিউ, যেখানে সুপ্রিম কোর্ট চূড়ান্ত রায় পুনর্বিবেচনা করতে পারে। অতীতে এই রিভিউতেই সাজা হ্রাস বা বাতিলের নজির রয়েছে। শেষ ধাপ রাষ্ট্রপতির ক্ষমা, সংবিধান অনুযায়ী যেটি মৃত্যুদণ্ড মকুব বা হ্রাস করার ক্ষমতা দেয়।
এই সবকিছুর কেন্দ্রে এখন একটি প্রশ্নই বারবার ফিরে আসছে—শেখ হাসিনা কি দেশে ফিরে আত্মসমর্পণ করবেন? নাকি আন্তর্জাতিক মঞ্চ থেকেই নিজের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে যাবেন?
ঢাকার রাজনৈতিক মহল বলছে, এই রায় বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রাজনীতির গতিপথ আমূল বদলে দিতে পারে। ছাত্র আন্দোলনের জোয়ারে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর এই রায় এক দিকে যেমন “আইনের শাসনের বিজয়”—তেমনই অন্য দিকে হাসিনার শিবিরের কাছে এটি একটি “রাজনৈতিক প্রতিশোধ।”
এর মাঝেই ভারত ও বাংলাদেশের সম্পর্কের ওপর নতুন করে ছায়া ফেলেছে এই সংকট। ভারতের ভূমিকাই আগামী দিনে নির্ধারণ করতে পারে, এই রায় কেবল একটি আদালতের সিদ্ধান্ত হয়ে থাকবে, নাকি দুই দেশের কূটনীতিতেও বড়সড় সংশোধনের সূচনা করবে।
➤ এখান থেকে কী হতে পারে
বাংলাদেশের রাজনীতি, আইন ও কূটনীতির সামনে চারটি বড় সম্ভাবনা
১. হাসিনা কি আত্মসমর্পণ করবেন?
রায়ের পর আপিলের একমাত্র শর্তই আত্মসমর্পণ। দিল্লিতে অবস্থান করায় সিদ্ধান্তটি শুধু আইনি নয়—কূটনৈতিকও। নিজ দলের উপর নিয়ন্ত্রণ, আন্তর্জাতিক সমর্থন এবং নিরাপত্তা—সব হিসেব করেই হাসিনাকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। আপাতত তাঁর বক্তব্যই ইঙ্গিত দিচ্ছে—তাড়াহুড়োর কোনও সম্ভাবনা নেই।
২. দিল্লি–ঢাকা সম্পর্ক নতুন মোড়ে
ঢাকা প্রকাশ্যে ভারতের কাছে হাসিনাকে প্রত্যর্পণের অনুরোধ করেছে। দিল্লি এখন ‘কূটনৈতিক ভারসাম্য’ বজায় রাখতে চাইছে। ভারত কোনও দিকেই স্পষ্টভাবে ঝুঁকছে না, কিন্তু এই চাপ বাড়লে দুই দেশের সম্পর্কে অস্বস্তি তৈরি হতে পারে।
বিশেষ করে সীমান্ত নিরাপত্তা, বাণিজ্য, জলবণ্টন—সবই এই উত্তাপের প্রভাব ফেলতে পারে।
৩. বাংলাদেশের অভ্যন্তরে উত্তেজনা বাড়ার আশঙ্কা
ট্রাইব্যুনালের রায়ের পর শহরজুড়ে নিরাপত্তা জোরদার হলেও পরিস্থিতি যে স্থিতিশীল নয়—তা প্রকাশ্য। আওয়ামী লীগের শরিক সংগঠনগুলি বিচ্ছিন্ন বিক্ষোভ শুরু করেছে। সামনে যদি তারা বৃহত্তর কর্মসূচি নেয়, তা অন্তর্বর্তী সরকারের কাজকে কঠিন করে দেবে।
৪. আইনি লড়াই দীর্ঘমেয়াদি হতে পারে
যদি হাসিনা দেশে ফেরেন, আইনি প্রক্রিয়া দীর্ঘ হতে পারে—আপিল, রিভিউ, তারপর রাষ্ট্রপতির ক্ষমা। তিন ধাপে আইনি লড়াই লম্বা হতে পারে কয়েক বছর।
আর যদি তিনি না ফেরেন—রায় কার্যকর করার প্রক্রিয়াই পরিণত হবে কূটনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রে।