মেয়েদের ব্রিগেড: জমা ক্ষোভের পাহাড় থেকে লাভা বিস্ফোরণ, প্রতিবাদীদের গর্জন বাঁধল ২৬-এর মুড!

নিজস্ব সংবাদদাতা, দাসপুর, ডেবরা ও মেদিনীপুর: স্কুল কলেজের ছাত্রী গৃহবধু থেকে নব্বইয়ের বৃদ্ধা, মেয়েদের ব্রিগেডে প্রতিবাদী কণ্ঠের গর্জনে যেন বেঁধে দিল ২৬-এর মুড।  পশ্চিম মেদিনীপুর জেলায় ১৫ অক্টোবর ৩টি ব্লকে মেয়েদের ব্রিগেড আয়োজন করা হয়। দাসপুর, ডেবরা ও মেদিনীপুরের তিনটি সভাতেই ছিল প্রতিবাদী মহিলাদের উপচে পড়া ভিড়।

নিম্নবিত্ত মধ্যবিত্ত বাড়ির মহিলাদের কী পরিমান ক্ষোভ জমে রয়েছে এই রাজ্য সরকারের বিরুদ্ধে তার হিমশৈলের চূড়াটা শুধু দেখা গেল এখানে। আন্দাজ করা যায় গোটা রাজ্যে কী পরিমান ক্ষোভের স্ফুলিঙ্গ দাবানল ছড়ানোর অপেক্ষায় রয়েছে। সভাগুলিতে এলাকার মহিলাদের সঙ্গে সরাসরি কথা বলা পরামর্শ দেওয়া ও তাঁদের সমস্যা নথিবদ্ধ করার জন্য উপস্থিত ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রী দ্বিধিতী রায়, আইনজীবী সব্যসাচী চ্যাটার্জী এবং চিকিৎসক সুদক্ষীণা দাস।

তিনটি সভায় উপস্থিত একের পর এক গৃহবধূ, স্কুল কলেজ পড়ুয়ারা প্রশ্ন ও বক্তব্যের মধ্যে দিয়ে গ্রাম বাংলার নগ্ন চেহেরাটা বেরিয়ে পড়ে। কী দমবন্ধ পরিবেশ! শিক্ষা স্বাস্থ্যর ভেঙে পড়া করুন ছবি, নারী নির্যাতন একের পর এক ধর্ষণের ঘটনা এবং থ্রেট  কালচারে মানুষের স্বাভাবিক জীবন যাত্রা দুর্বিষহ হয়ে পড়েছে তা উঠে আসে। একের পর এক গ্রাম মদ ও জুয়ার ঠেকে পরিণত হয়েছে তার প্রতিকারে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলার অঙ্গিকার ফুটে ওঠে তাঁদের গলায়। এমনকি এক কলেজ ছাত্রী প্রয়োজনে মদের বোতলকেই অস্ত্র করার ভাবনা ব্যক্ত করেন। তবে উপস্থিত নেতৃত্ব মহিলাদের আইন না ভেঙে আন্দোলন গড়ে তোলার পথ দেখান।  

দাসপুর থানার সোনাখালিতে এক অর্ডিটোরিয়াম মেয়েদের ব্রিগেড সভার মহিলাদের সমাগমও ছিল নজর কাড়া। হল উপচে রাস্তা এমনি খোলা ব্যালকনিতে ত্রিপলেও জায়গা দেওয়া সম্ভব হচ্ছিল না। এই ভিড় যেন নিজেদের অধিকার আদায়ের লড়াইয়ের শপথ নিলেন। দাবি তুললেন চাই না এমন ভাতা, চাই নারী নিরাপত্তা, স্বনির্ভর হওয়ার পদক্ষেপ ও একশো দিনের কাজ।

গ্রামে কাজ নেই বলে বাড়ির পুরুষরা, আজ ঘরছাড়া গ্রাম ছাড়া পরিযায়ী  শ্রমিক। ভয়ে, নিরাপত্তা হীনতায় আজ গ্রামের মহিলারা। থ্রেট  কালচারের এমন পরিবেশে দমবন্ধ অবস্থায় গ্রামের মদের ঠেক এড়িয়ে মদ্যপ বাহিনীর দাপটের কাছে নীরব থাকতে হয়। ধর্ষকদের শাস্তি হয় না। দুর্নীতিবাজরা বুক ফুলিয়ে ঘুরে বেড়ায়। এমন পরিস্থিতিতে যে অনেক দিন পর মন খুলে কথা বলতে মেয়েদের ব্রিগেডে হাজির হয়েছিলেন শয়ে শয়ে মহিলারা।

ডেবরা এবং মেদিনীপুর শহর দুই সভায়ও মহিলা সহ স্কুল কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়িয়াদের অংশ গ্রহন নজর কাড়ে। দাসপুরের সভাতেও উঠে আসে গ্রামপঞ্চায়েত এলাকার স্বাস্থ্য কেন্দ্রগুলি বেহাল দশার ছবি। দাসপুরের গ্রামীন হাসপাতালে রোগী নিয়ে গেলে পরিষাবার থেকে বেশি জোটে দুর্ব্যবহার। নোংরা আবর্জনার স্তূপের মাঝে স্বাস্থ্য পরিষেবার নামে রোগীকে রেফার চিঠি। আর ঘাটাল মহকুমা নামেই সুপার স্পেশালিটি হাসপাতাল। কেবল প্রসূতি বিভাগ ছাড়া আর কোনেও বিভাগেই নাম মাত্র সপ্তাহে দুই দিন চিকিৎসা মেলে। তাতেও বাইর থেকে স্যালাইন ওষুধ কিনেন দিতে হয় রোগীর পরিবারকে।

স্কুল গুলিতে বিষয় ভিত্তিক সব শিক্ষক নেই। আবার কোথাও পঞ্চম  থেকে দ্বাদশ পর্যন্ত কোনেও বিষয়ে একজন শিক্ষকই রয়েছেন। সরকারি  শিক্ষার এমন করুন দশা তুলে ধরেন স্কুলের মেয়েরা। প্রশ্ন তোলেন এরাজ্যে ধর্ষকদের শাস্তি দিতে পারে না কেনেও মহিলা মুখ্যমন্ত্রী। তিনি নিরাপত্তার ঘেরাটোপে থাকেন। তাহলে আমরা মহিলারা কি সন্ধ্যার আগেই ঘরে ঢুকে পড়বে?

সভা থেকে আইনি সহায়তা কেন্দ্র  চালু, কর্মরত মহিলাদের সন্তানের জন্য ক্রেশ তৈরি , মহিলাদের জন্য পাবলিক টয়লেট, পাড়ায় নারী নিরাপত্তার সমস্যা থেকে গার্হস্থ্য হিংসা, সেল্ফ ডিফেন্স, ক্যাম্পাস থেকে রাজপথ ছাত্রীসহ সমস্ত নারীর স্বাধীন – নিরাপদ জীবনের অধিকার নিশ্চিত করতে মহিলারা আর থ্রেট কালচারের কাছে মাথানত করতে নারাজ। একত্রিত হয়ে ভয়ভীতির রাজনীতি মুক্ত পরিবেশ গড়তে মেয়েদের ঐক্যবদ্ধ হয়ে লড়াইয়ের পথ নতুন মাত্রায় ছড়িয়ে পড়ার শপথ নিলেন মেয়েরা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *