নিজস্ব সংবাদদাতা, মেদিনীপুর: পাঠ্যবইতে বিভেদের সিলেবাস, ক্লাসরুমের বেঞ্চে জাতপাতের ভাগাভাগি রুখে দেওয়ার শপথে— ‘শিক্ষা বাঁচাও, দেশ ও রাজ্য বাঁচাও’— এই আহ্বানে মেদিনীপুর শহরে এসএফআই জেলা কমিটির ডাকে মিছিল সহকারে সমাবেশ হয় শনিবার মেদিনীপুর কলেজ সংলগ্ন নেতাজি মূর্তির পাদদেশে।
সমাবেশ শেষে বর্তমান সময়ে শিক্ষাঙ্গনের পরিকাঠামোর সংকট, দমন-পীড়ন, নৈরাজ্যের বিরুদ্ধে এবং গণতান্ত্রিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনার লড়াইকে শক্তিশালী করা সহ ‘শিক্ষাঙ্গন হোক মুক্ত চিন্তার— ভাঙুক শাসকের ত্রাস’— এই লক্ষ্যে সংগঠনের জেলা সাংগঠনিক কনভেনশন হয়।
প্রকাশ্য সমাবেশে সংগঠনের রাজ্য সম্পাদক দেবাঞ্জন দে বলেন, যারা সরকারি স্কুল–কলেজ তুলে দিয়ে বেসরকারি ও কর্পোরেটদের হাতে শিক্ষাব্যবস্থা তুলে দিতে তৎপর, যারা টাকার বিনিময়ে পাঠদান ব্যবস্থা প্রসারে আগ্রহী, যারা ক্লাসরুমে ও মিড-ডে মিলে সহপাঠীদের ভাগ করে দিতে চায়— তারা মানবতার শত্রু এবং দেশদ্রোহী। কারণ তারা জানে, সবার শিক্ষার পরিকাঠামো ও উন্নয়ন হলে ছাত্রছাত্রীরা প্রশ্ন করবে, নিজেদের অধিকারের বিষয়ে জানতে চাইবে। তাই এই রাজ্যে ইতিমধ্যেই ৮ হাজারের বেশি স্কুল বন্ধ হয়ে গেছে। বেশির ভাগ স্কুল বিষয়ভিত্তিক এবং প্রয়োজনমতো শিক্ষক নিয়োগ না করেই চলছে। শিক্ষক নিয়োগে সীমাহীন দুর্নীতি, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য পরিষেবার মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে অবহেলা, সর্বোপরি গণতান্ত্রিক শিক্ষা-পদ্ধতিকে ধ্বংস করে লুঠ ও নৈরাজ্যের পরিবেশ কায়েম— এর বিরুদ্ধে ছাত্রসমাজকে একত্রিত করে আন্দোলন তীব্র করার লক্ষ্যে এসএফআই দেশ ও রাজ্য জুড়ে আন্দোলন সংগঠিত করছে।
এ প্রসঙ্গে তিনি আরও বলেন, রাজ্য সরকার ও শাসকদলকে বলব— আপনারা কলেজে নির্বাচনের বিষয়ে ভয় পাচ্ছেন কেন? কারণ আপনাদের জালিয়াতি, দুর্নীতি এবং কলেজে ভর্তি প্রক্রিয়ায় তোলাবাজির ঘটনায় ছাত্রসমাজ ক্ষুব্ধ। ঘাটাল কলেজে নকল রসিদে ছাত্র ভর্তি করিয়ে তৃণমূল ছাত্রপরিষদ নামধারী বহিরাগতরা প্রায় ২৮ লক্ষ টাকা লুঠ করেছে— এমন নজির রয়েছে। এদের জেলে থাকার কথা। কিন্তু মমতার পুলিশ প্রশাসন এই বহিরাগত তোলাবাজদের পাহারা দেয়, আর এসএফআই কর্মীদের নামে মিথ্যা মামলায় ফাঁসিয়ে দমন-পীড়ন ও অত্যাচার চালায়। এত সব সত্ত্বেও এসএফআই-কে দমিয়ে রাখা যাবে না। এই নৈরাজ্যকারী তৃণমূল সরকার ও বিভেদকারী বিজেপি সরকারের ছাত্র-বিরোধী, দেশবিরোধী পদক্ষেপ রুখে দেওয়ার লড়াই বুক চিতিয়ে করবে।

সমাবেশে সংগঠনের জেলা সম্পাদক রণিত বেরা বলেন, আজকের আমাদের কর্মসূচি বানচাল করতে গতকাল থেকেই কলেজে কলেজে তৃণমূল ছাত্রপরিষদ নামধারী বহিরাগত তোলাবাজ বাহিনী হুমকি দিচ্ছে— ফোন করে মেসেজ পাঠিয়ে জানিয়েছে, এসএফআই-এর কর্মসূচিতে যোগ দিলে কলেজে ঢুকতে দেওয়া হবে না। একাধিক স্ক্রিনশট তুলে ধরে তিনি বলেন, ক্ষমতা থাকলে কলেজে কলেজে নির্বাচিত ছাত্র সংসদের দাবিতে নির্বাচনে আসুন। ছাত্রসমাজ বুঝিয়ে দেবে তোমাদের এই হুমকি–চমকানির ফল কী হয়।
তিনি আরও বলেন, এই মেদিনীপুর কলেজে গতকালও বহিরাগতদের উপস্থিতিতে হামলার চেষ্টা করা হয়। এসএফআই তা রুখে দিয়েছে। গত ৩ মার্চ এই বহিরাগতরা পুলিশ পাহারায় কলেজ ক্যাম্পাসে ঢুকে ছাত্রীদের উপর হামলা করে এবং এক কলেজ ছাত্রীকে তুলে নিয়ে যায়। উল্টে পুলিশ ঐ ছাত্রীকেই গ্রেপ্তার করে সারা রাত অত্যাচার চালায়। কলেজ কর্তৃপক্ষ সেই ঘটনার সিসিটিভি ফুটেজ মুছে দেয়। এর বিরুদ্ধে ওই পুলিশ অফিসারকে হাইকোর্টে গিয়ে ক্ষমা চাইতেও হয়েছে, এবং তার বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ কার্যকর করতেই বাধ্য হয়। সেই মেদিনীপুর কলেজ প্রাঙ্গনেই আজকের এই সমাবেশ— সমস্ত প্রতিকূলতা ও বাধাকে উপেক্ষা করে।
জেলার ২৭টি সাধারণ কলেজ, আইন কলেজ, মেডিকেল কলেজ, হোমিওপ্যাথি কলেজ, বিদ্যাসাগর বিশ্ববিদ্যালয়ের চারটি ইউনিট সহ জেলার ১৪৫টি স্কুল ইউনিটের প্রতিনিধিরা এই কর্মসূচিতে অংশ নেন।
‘উষার দুয়ারে হানি’— ‘আঘাত, আমরা আনিব রাঙা প্রভাত’— এই শপথে— ‘চলো যাই স্কুল–কলেজে, প্রশ্নে ভরুক ক্লাস; শিক্ষায় হোক মুক্ত চিন্তা— ভাঙুক শাসকের ত্রাস’— এই লক্ষ্য নিয়ে স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে আগামীর রাজনৈতিক–সাংগঠনিক অভিমুখ স্থির করা সহ আন্দোলন গড়ে তোলার একগুচ্ছ কর্মসূচির রূপায়ণে এই সাংগঠনিক কনভেনশন শুরু হয়েছে।
সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন সংগঠনের জেলা সভাপতি সুকুমার মাঝি।