কাঁঠালগাছ থেকে ‘রক্ত’ ঝরছে! কুসংস্কারে ছড়াল আতঙ্ক, যুক্তি দিয়ে বোঝাল বিজ্ঞান মঞ্চ

নিজস্ব সংবাদদাতা, চন্দ্রকোনা | ২৮ অক্টোবর: কাঁঠালগাছ থেকে ঝরছে লাল তরল! গ্রামের মানুষ বলছে— রক্ত!
এই দৃশ্য চোখে পড়তেই মুহূর্তে ছড়িয়ে পড়ল আতঙ্ক, কৌতূহল আর গুজব। পশ্চিম মেদিনীপুরে চন্দ্রকোনা ১ নম্বর ব্লকের লক্ষ্মীপুর গ্রাম পঞ্চায়েতের নতুন গ্রামে এই ‘অলৌকিক’ ঘটনা ঘিরে চারদিন ধরে চলছে চাঞ্চল্য। কেউ বলছেন, “দেবীর উপস্থিতি”, কেউ আবার “অমঙ্গলের বার্তা”— এইসব কথায় ভরেছে গোটা গ্রাম।

গ্রামেরই এক গৃহবধূ মমতা মিদ্যার বাড়ির উঠোনে থাকা পুরনো কাঁঠালগাছ থেকেই দেখা যায়, গাছের গুড়ি থেকে লালচে এক তরল ধীরে ধীরে মাটিতে গড়িয়ে পড়ছে। কেউ মোবাইলে ভিডিও তুলেছেন, কেউ আবার পুজো শুরু করেছেন। গাছতলায় ঘট, ধূপধুনো, সিঁদুরে পূজা— যেন অলৌকিক কোনও দেবতার আরাধনা চলছে!

কিন্তু সত্যি কি রক্ত ঝরছে?
না, বলছে বিজ্ঞান।

ঘটনাস্থলে পৌঁছন পশ্চিমবঙ্গ বিজ্ঞান মঞ্চের কর্মীরা। তাঁরা স্থানীয়দের বোঝান— এ কোনও ‘অলৌকিক’ বা ‘অশুভ’ ঘটনা নয়, বরং একেবারেই বিজ্ঞানসম্মত প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া।
বিজ্ঞান মঞ্চের কর্মী বাবুলাল শাসমল বলেন, “আমাদের শরীরে যেমন নানা হরমোন ও এনজাইম থাকে, তেমনই গাছের শরীরেও থাকে বিভিন্ন রঞ্জক পদার্থ ও শর্করা। মাটির প্রকৃতি ও আঘাতের কারণে কাণ্ডে ফাটল ধরলে সেই পদার্থ বেরিয়ে আসে। এই গাছের তরল পদার্থে লালচে রঙের উপস্থিতিই ‘রক্তের মতো’ দেখাচ্ছে।”

বিদ্যাসাগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ডক্টর অমল কুমার মণ্ডল ব্যাখ্যা করেছেন, “কাঁঠাল জাতীয় গাছে লেটেক্স নামক পদার্থ থাকে। এটি অনেক সময় লাল, সাদা, হলুদ বা বর্ণহীন হতে পারে। এখানে গাছের লাল রঙের লেটেক্সই মাটিতে গড়িয়ে পড়ছে।”

একই মত প্রাক্তন অধ্যাপক ও পশ্চিমবঙ্গ বিজ্ঞান মঞ্চের রাজ্য সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য ডক্টর তপন মিশ্রেরও। তাঁর কথায়, “কাঁঠালের কাণ্ড থেকে যে রস বেরোয়, তাতে ক্যারোটিনয়েড রঞ্জক পদার্থ থাকার জন্য তা লালচে দেখায়। এর মধ্যে রক্তের উপাদান যেমন আরবিসি বা ডব্লিউবিসি নেই, আর তা অক্সিজেন বহনও করতে পারে না। এই তরল সম্পূর্ণভাবে লৌকিক ও বিজ্ঞানসম্মত।”

তবুও গ্রামে এখনও ভয় মিশ্রিত কৌতূহল বজায় আছে। কেউ বিশ্বাস করছেন ‘অলৌকিকতা’, কেউ আবার বিজ্ঞানের ব্যাখ্যায় আশ্বস্ত। তবে এই ঘটনা আবারও চোখে আঙুল দিয়ে দেখাল— গুজবের চেয়ে বিজ্ঞানকে বোঝা কতটা জরুরি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *