এপস্টিন ফাইলসে মোদির নাম: ‘চুপ থাকাই কি স্বীকারোক্তি?’— বিরোধীদের কাঠগড়ায় প্রধানমন্ত্রী

নয়া দিল্লি: জেফ্রি এপস্টিনের মতো এক জন দণ্ডিত যৌন অপরাধীর নাম শুনলেই গোটা বিশ্বের রাজনীতি থেকে হলিউড—সব জায়গায় অস্বস্তি শুরু হয়ে যায়। এবার সেই এপস্টিনের প্রকাশিত নথিতে খুব অস্বস্তিকর ভাবে উঠে এসেছে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নাম। আর তাতেই প্রশ্নের মুখে দেশের শাসক দল ও প্রশাসকরা। এমন গুরুতর ইস্যুতে কোনও রকম রেয়াত করছে না বিরোধীরাও। কিন্তু সব প্রশ্নের মুখে এবারও মোদি নিরব।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ সম্প্রতি প্রকাশিত ইমেলে দেখা গিয়েছে লেখা হয়েছে: “The Indian Prime Minister Modi took advice, and danced and sang in Israel for the benefit of the US president. They had met a few weeks ago. IT WORKED.”

(“ভারতের প্রধানমন্ত্রী মোদি পরামর্শ নিয়েছিলেন এবং আমেরিকার প্রেসিডেন্টের সুবিধার্থে ইসরায়েলে নেচেছেন গেয়েছেন। তাঁরা কয়েক সপ্তাহ আগে দেখা করেছিলেন। এটা কাজ করেছে।”) — এমন ভাষায় ইমেলটিতে লেখা ছিল বলে প্রকাশিত স্ক্রিনশটে দেখা গিয়েছে।

এর পরই মোদির ২০১৭ সালের ইসরায়েল সফরের উল্লেখ ঘিরে শুরু হয়েছে প্রবল বিতর্ক। সরকার একে ‘ভিত্তিহীন’ বলে উড়িয়ে দিলেও বিরোধীদের বক্তব্য—প্রধানমন্ত্রী কেন নিজে মুখ খুলছেন না? বাম দল সিপিআইএম-ও সরকারের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। তাদের মতে, আন্তর্জাতিক স্তরে এমন অভিযোগ উঠলে তা ধামাচাপা দেওয়া যায় না।

জেফ্রি এপস্টিনের বিরুদ্ধে প্রধান অভিযোগগুলি ছিল অপ্রাপ্তবয়স্কদের যৌন নিপীড়ন ও পাচার, ১৪ থেকে ১৭ বছর বয়সি কিশোরীদের যৌন নির্যাতন, টাকার লোভ দেখিয়ে তাদের নিজের বাড়িতে ডেকে আনা, পরে ধনী ও প্রভাবশালী ব্যক্তিদের কাছে পাঠানো। এই অভিযোগগুলো আমেরিকার বিভিন্ন আদালতে একাধিক ভুক্তভোগী তুলেছিলেন।

জেফরি এপস্টিন ২০১৯ সালে নিউইয়র্কের জেলে থাকাকালীন আত্মহত্যা করেন বলে সরকারের তরফে জানানো হয়। যদিও তার মৃত্যু নিয়ে অনেক রহস্য ও প্রশ্ন রয়েছে। এমনকি এও দাবি করা হয়, প্রভাবশালীদের বাঁচাতে তাঁকে পরিকল্পিত ভাবে খুন করা হয়েছে।

তাঁর বিরুদ্ধে অপ্রাপ্তবয়স্কদের পাচার এবং যৌন শোষণের গুরুতর অভিযোগ ছিল। মার্কিন সরকার এখন সেই তদন্তের সমস্ত নথি জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করছে, যার ফলে বিশ্বের অনেক প্রভাবশালী ব্যক্তি ও রাষ্ট্রপ্রধানের নাম আলোচনায় উঠে আসছে। যদিও মার্কিন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল টড ব্ল্যাঞ্চ জানিয়েছেন, স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের ‘এপস্টিন ফাইল ট্রান্সপারেন্সি অ্যাক্ট’-এর অধীনে গত শুক্রবার প্রায় ৩০ লক্ষ পৃষ্ঠার নথি, ২ হাজার ভিডিও এবং ১ লাখ ৮০ হাজার ছবি জনসমক্ষে প্রকাশ করা হয়। এই বিপুল পরিমাণ নথির মধ্যে একটি ই-মেলে ২০১৭ সালে প্রধানমন্ত্রী মোদীর ইসরায়েল সফরের প্রসঙ্গ রয়েছে।

শনিবার এক বিবৃতিতে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল বলেছেন, ‘আমরা তথাকথিত এপস্টিন ফাইল থেকে একটি ইমেল বার্তার রিপোর্ট দেখেছি যেখানে প্রধানমন্ত্রীর ইসরায়েল সফরের উল্লেখ রয়েছে। ২০১৭ সালের জুলাই মাসে প্রধানমন্ত্রীর সফর সরকারি সফর, এটা বাস্তব। ওই ইমেলে বাকি এক জন সাজা প্রাপ্ত অপরাধী যা ইঙ্গিত বা দাবি করেছেন তা আজগুবি প্রলাপ ছাড়া কিছুই নয়। এ ধরনের দাবিকে চরম অবজ্ঞার সঙ্গে প্রত্যাখ্যান করা উচিত।’

কংগ্রেসের তোপ: ‘এটা গুজব নয়, এটা দেশের মর্যাদার প্রশ্ন’

কংগ্রেস এই ইস্যুতে সবচেয়ে আক্রমণাত্মক অবস্থান নিয়েছে। দলের শীর্ষ নেতাদের বক্তব্য, এপস্টিনের মতো আন্তর্জাতিক অপরাধীর নথিতে যদি ভারতের প্রধানমন্ত্রীর নাম আসে, তা হলে শুধু সরকারি বিবৃতি দিয়ে দায় সারা যায় না।

কংগ্রেস নেত্রী সুপ্রিয়া শ্রীনেত সরাসরি প্রশ্ন তুলেছেন— “এপস্টিন কে, সেটা সবাই জানে। তার নথিতে ভারতের প্রধানমন্ত্রীর নাম কেন থাকবে? সরকার যদি বলেই দেয় সব মিথ্যে, তা হলে প্রধানমন্ত্রী নিজে সামনে এসে কথা বলছেন না কেন?” সুপ্রিয়ার আরও কড়া মন্তব্য— “মোদিজি সব বিষয়ে টেলিভিশনে কথা বলেন, নির্বাচনের আগে লাইভে আবেগ দেখান। কিন্তু এপস্টিনের মতো অপরাধীর প্রসঙ্গে হঠাৎ এই নীরবতা কেন?”

কংগ্রেস নেতা পবন খেরা মোদী সরকারের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তিনি অভিযোগ করেন যে, এই ধরনের একজন কলঙ্কিত ব্যক্তির ইমেলে ভারতের প্রধানমন্ত্রীর নাম থাকাটা কূটনৈতিক শিষ্টাচার ও স্বচ্ছতার ক্ষেত্রে বড় প্রশ্নচিহ্ন রয়েছে।

‘আজগুবি প্রলাপ’ বললেই কি দায় শেষ?

পররাষ্ট্র মন্ত্রক এপস্টিনের ইমেলকে “এক দণ্ডিত অপরাধীর আজগুবি প্রলাপ” বলে খারিজ করেছে। কিন্তু কংগ্রেসের পাল্টা প্রশ্ন—
এই যুক্তি কি যথেষ্ট?

কংগ্রেসের বক্তব্য,

  • প্রশ্নটা এপস্টিনকে বিশ্বাস করার নয়,
  • প্রশ্নটা হলো—এই নামটা এল কীভাবে?
  • আর এল যখন, তখন প্রধানমন্ত্রীর তরফে সরাসরি ব্যাখ্যা কেন নেই?

বিরোধীদের অভিযোগ, সরকার বরাবরের মতোই বিষয় ঘুরিয়ে দিতে চাইছে—দলীয় মুখপাত্র সামনে রেখে, কিন্তু শীর্ষ নেতৃত্ব আড়ালে।

মোদির নীরবতা ঘিরে বাড়ছে সন্দেহ

এই মুহূর্তে সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক প্রশ্ন—
মোদি কেন নিজে কথা বলছেন না?

কংগ্রেসের দাবি, যে প্রধানমন্ত্রী নিজের ইমেজ নিয়ে এত সচেতন, যিনি প্রতিটি আন্তর্জাতিক সফরকে ‘ঐতিহাসিক’ বলে প্রচার করেন, তিনি এপস্টিন প্রসঙ্গে কেন শুধু আমলাদের দিয়ে বিবৃতি দেওয়াচ্ছেন? এক কংগ্রেস নেতার মন্তব্য, “এটা শুধু রাজনৈতিক বিতর্ক নয়। এটা ভারতের প্রধানমন্ত্রীর বিশ্বাসযোগ্যতার প্রশ্ন।”

সংসদে আলোচনার দাবি, রাস্তায় প্রতিবাদের ইঙ্গিত

কংগ্রেস জানিয়েছে, এই বিষয়টি সংসদে পূর্ণাঙ্গ আলোচনার দাবি জানানো হবে। তাদের বক্তব্য,

  • সরকার মুখে বলছে ‘কিছু নেই’,
  • কিন্তু আলোচনায় যেতে ভয় পাচ্ছে।

সব মিলিয়ে চাপ বাড়ছে মোদির উপর

এপস্টিন ফাইলসে নাম আসা—হোক তা ইমেল মাত্র—বিরোধীদের হাতে এখন এক শক্তিশালী রাজনৈতিক অস্ত্র। কংগ্রেস স্পষ্ট করে জানিয়ে দিয়েছে, এই ইস্যুতে তারা পিছোবে না।

এক দিকে সরকারের ‘সব মিথ্যে’ দাবি, অন্য দিকে প্রধানমন্ত্রীর নীরবতা— এই দুইয়ের মাঝখানেই প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে—

মোদিজি, আপনি নিজে মুখ খুলছেন না কেন?

এই প্রশ্নের উত্তর না মিললে বিতর্ক যে আরও তীব্র হবে, তা এখনই স্পষ্ট।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *