চলে গেলেন অবিভক্ত মেদিনীপুর জেলার প্রাক্তন সিপিআইএম সম্পাদক তথা অধ্যাপক দীপক সরকার। তাঁর প্রয়াণে গভীর শোকে নিমজ্জিত জেলা তথা রাজ্যের পার্টি নেতৃত্ব কর্মী সমর্থকরা। সোমবার মেদিনীপুর শহরের বিধাননগরে নিজের বাস ভবনে রাত ১১টা ১৫ মিনিট নাগাদ শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন। বয়স হয়েছিল ৮৫ বছর।
কর্মজীবনে শিক্ষক হিসেবে মেদিনীপুরে নির্মল হৃদয় আশ্রম স্কুলে এবং পরে পুরুলিয়ার রঘুনাথপুর কলেজ ও মেদিনীপুর কলেজে অধ্যাপনা করেছেন। দায়িত্ব পালন করেছেন জেলা প্রাথমিক শিক্ষা সংসদের চেয়ারম্যান হিসেবে। স্বাধীনতা সংগ্রামী তথা কমিউনিস্ট নেতা সুকুমার সেনগুপ্তর আহ্বানে তিনি বামপন্থী রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন। রাজনৈতিক নেতা হিসেবে চষে বেড়িয়েছেন অবিভক্ত মেদিনীপুর জেলার লালগড়, বেলপাহাড়ি, গোপীবল্লভপুর, ঝাড়গ্রাম, শালবনী, গোয়ালতোড় গড়বেতা, মেদিনীপুর, খড়্গপুর, ঘাটাল, দাঁতন, নারায়ণগড় থেকে এগরা, কাঁথি, হলদিয়া, তমলুক,পাঁশকুড়া জুড়ে।
দীপক সরকার ছিলেন এমন এক মানুষ, যিনি কেবল রাজনীতিবিদ নন, ছিলেন এক আদর্শবাদী শিক্ষক, ত্যাগী সংগঠক, আর অবিভক্ত মেদিনীপুরের উন্নয়নের অন্যতম রূপকার। মেদিনীপুর কলেজের প্রাক্তন অধ্যাপক হিসেবে ছাত্রদের কাছে ছিলেন প্রেরণার প্রতীক। আবার রাজনীতিতে পা রাখার পর থেকে শ্রমিক ও কৃষক আন্দোলনের সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন অকুতোভয়ে দৃঢ়তার সঙ্গে। শিক্ষার সঙ্গে ছিলেন ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক প্রেমী। তাই সে সব ক্ষেত্রে পরিকাঠামো গড়ে তোলার কান্ডারি।
শিক্ষকতার সঙ্গে সঙ্গেই শুরু হয় রাজনীতি। ১৯৬৬ সালে কমিউনিস্ট পার্টির সদস্যপদ পান৷ ১৯৬৮-তে সিপিআইএমের রাজ্য সম্মেলনে প্রথম প্রতিনিধি হন৷ ১৯৭১ সাল থেকে তিনি অবিভক্ত মেদিনীপুরের জেলা সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য৷ দলের সর্বক্ষণের কর্মী হওয়ার জন্য ১৯৮৪-তে অধ্যাপনা ছাড়েন৷ ১৯৮৫ থেকেই তিনি রাজ্য কমিটির সদস্য৷ ১৯৯২ সালের ২৪ জানুয়ারি অখন্ড মেদিনীপুরের জেলা সম্পাদক নির্বাচিত হন। টানা ২৪ বছর অবিভক্ত মেদিনীপুর ও অবিভক্ত পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার পার্টির সম্পাদক পদে দায়িত্ব পালন করে গেছেন। ২০১০ সালে সিপিআইএমের রাজ্য সম্পাদকমন্ডলীর সদস্য হন। ২০১৫ সালে, পার্টির নিয়ম মেনে জেলা সম্পাদকের পদ থেকে অব্যাহতি নেন। ২০২২ সাল পর্যন্ত পার্টির রাজ্য সম্পাদকমন্ডলীর সদস্য ছিলেন দীপকবাবু।পাশাপাশি শ্রমিক সংগঠন সহ ট্রেড ইউনিয়ের জেলা ও রাজ্য স্তরের সংগঠক ছিলেন।
অবিভক্ত মেদিনীপুরে নানা উন্নয়ন কর্মযজ্ঞের তিনিই ছিলেন অন্যতম কান্ডারী। বিদ্যাসাগর বিশ্ববিদ্যালয়, শহীদ ক্ষুদিরাম পরিকল্পনা ভবন, জেলা স্পোর্টস ডেভেলপমেন্ট অ্যাকাডেমি, বিদ্যাসাগর ইনস্টিটিউট অফ হেলথ, বিদ্যাসাগর ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্ক,ডেবরা কলেজ ,কুলটিকরী কলেজ, গোয়ালতোড় কলেজ, কেশপুর কলেজ সহ নানা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন অন্যতম কান্ডারী। প্রতিটি প্রকল্পের পেছনে ছিল তাঁর চিন্তা ও সুসংহত পরিকল্পনা। তিনি তাঁর সহযোগীদের সাথে নিয়ে সেগুলো রূপায়িত করেছেন। এমনকি মেদিনীপুর মেডিকেল কলেজ গড়ে ওঠার স্বপ্নও বাস্তবে রূপ পেয়েছিল তাঁর নিরলস প্রচেষ্টায়।তিনি জানতেন, উন্নয়নের প্রকৃত মানে কেবল ইট-পাথরের গাঁথুনি নয়, মানুষের জীবনের মানোন্নয়ন।
দীপক সরকারের প্রয়াণের সঙ্গে সঙ্গে মেদিনীপুরের আকাশ যেন একটুখানি নিঃশব্দ হয়ে যায়। দলমত নির্বিশেষে মানুষ স্মরণ করে এক নিঃস্বার্থ কর্মীকে, এক চিন্তাশীল নেতাকে, এক সত্যিকারের রাজনৈতিক নেতাকে।
মঙ্গলবার সকালে প্রথমে তাঁর মরদেহ যায় তাঁর গড়ে তোলা বিদ্যাসাগর ইন্সটিটিউট অব হেলথে (VIH)। সেখান থেকে মরদেহ পৌঁছায় তাঁর গড়ে তোলা আর এক প্রতিষ্ঠান মেদিনীপুর স্পোর্টস ডেভেলপমেন্ট একাডেমিতে। সেখানে তাঁকে শ্রদ্ধা জানান একাডেমির কর্মকর্তা ও বিভিন্ন ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের প্রতিনিধিরা। এর পর মরদেহ মেদিনীপুর কলেজে আসে । সেখানে শ্রদ্ধা জানান কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ অধ্যাপক সত্যরঞ্জন ঘোষ সহ অন্যান্যরা। এরপর দেহ নিয়ে যাওয়া হয় তার পৈত্রিক ভিটে সহ অন্যান্য ভাইদের বাসস্থান শহরের মীরবাজারের বাড়ীতে।
এর পর মরদেহ জেলা সিপিআইএম কার্যালয়ে নিয়ে আসা হয় সেখানে শ্রদ্ধা জানান সিপিআইএম এর রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিম, সহযোদ্ধা ডাঃ সূর্যকান্ত মিশ্র,শ্রীদীপ ভট্টাচার্য,পলাশ দাশ,অভয় মুখার্জি, পরেশ পাল সহ সিপিআইএম এর জেলা সম্পাদক বিজয় পাল, প্রাক্তন দুই জেলা সম্পাদক তরুণ রায় ও সুশান্ত ঘোষ,
কৃষকসভার জেলা সম্পাদক মেঘনাদ ভূঁইয়া,সিটুর জেলা সম্পাদক গোপাল প্রামাণিক সহ সিপিআইএম অন্যান্য জেলা নেতৃত্ব ও এরিয়া কমিটির নেতৃবৃন্দ সহ বিভিন্ন গণসংগঠনের নেতৃবৃন্দ। শ্রদ্ধা জানান পূর্ব মেদিনীপুর, ঝাড়গ্রাম,বাঁকুড়ার সিপিআইএম এর জেলা সম্পাদক সহ নেতৃত্ববৃন্দ।
এদিন সকালে দীপক বাবুর বাসভবনে গিয়ে শ্রদ্ধা জানিয়ে আসেন তৃণমূল কংগ্রেস এর বিধায়ক সুজয় হাজরা, পুরপ্রধান সৌমেন খান সহ প্রমুখ। সিপিআইএম জেলা অফিসে এসে শ্রদ্ধা জানান কংগ্রেস নেতা দেবাশীষ ঘোষ,পংকজ পাত্র, এস ইউ সি আই নেতা অমল মাইতি, সিপিআইএমএল নেতা শৈলেন মাইতি, সিপিআই নেতা অশোক সেন, গিয়াসুদ্দিন, বিপ্লব ভট্ট, আর এস পি নেতা জয়ন্ত পাত্র, ফরোয়ার্ড ব্লক নেতা আনোয়ার রেজা,অন্যান্যরা সহ বিজেপি নেতা অরূপ দাস, শ্রদ্ধা জানান বিশিষ্ট সঙ্গীত শিল্পী জয়ন্ত সাহা, সঙ্গীত শিল্পী আলোক বরণ মাইতি, চিকিৎসক ডাঃ বি বি মন্ডল, চিকিৎসক ডাঃ বিমল গুড়িয়া, ডাঃ সুদীপ চৌধুরী সহ সমাজের বিভিন্ন অংশের মানুষ।
বেলা দুটায় জেলা দপ্তর থেকে মরদেহ নিয়ে মেদিনীপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের উদ্দেশ্য শেষ যাত্রা শুরু হয় ৮৫ টি অর্ধনমিত লাল পতাকায় এবং ইন্টারন্যাশনাল গান সহকারে। চোখের জলে ভারাক্রান্ত হয় মেদিনীপুর শহর। শ্রমজীবী মানুষের কান্না। শহরের রাজপথ মানুষের দখলে চলে যায়।
অবিভক্ত মেদিনীপুর জেলার বহু প্রান্তিক গ্রাম থেকে মানুষ হাজির হোন মালা ফুল নিয়ে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে। প্রায় ৬ কিমি পথে শহরের রিংরোডের মোড়ে মোড়ে মানুষের ঢল। আধুনিক মেদিনীপুর শহর গড়ে তোলার রূপকার, মেদিনীপুর খড়্গপুর উন্নয়ন পর্ষদ তারই চিন্তা প্রসূতি নগরায়ন ও খড়্গপুরে বিদ্যাসাগর শিল্পতালুক ও শালবনীর জিন্দালদের ইস্পাত কারখানার গড়ে তোলার লক্ষ্যে।
শেষ যাত্রা শেষে প্রয়াত দীপক সরকারের দেহ মেদিনীপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের হাতে তুলে দেওয়া হয়। সেখানে অধ্যক্ষ, এমএসভিপি সহ আধিকারীক বৃন্দ মালা দিয়ে শেষ শ্রদ্ধা জানিয়ে দেহ গ্রহন করেন সংরক্ষণের জন্য। নিজের হাতে গড়ে তোলা মেডিকেল কলেজে চিকিৎসা শিক্ষার স্বার্থে নিজের দেহ দানের অঙ্গীকার মতো পরিবারের লোকজন সেই দেহ তুলে দেন ইন্টার ন্যাশলেন গানের মধ্যদিয়ে।
দীপকবাবু রেখে গেলেন পুত্র ডাঃ সুদীপ্ত সরকার,কন্যা শর্মিষ্ঠা দাস, পুত্রবধূ সুজয়া সরকার,জামাতা ও নাতি নাতনিদের। পাশাপাশি রেখে গেলেন অসংখ্য গুণগ্রাহীকে।
লাল সেলাম