সিএএ-র নামে বিজেপির বিপজ্জনক রাজনীতি নাগরিকত্বের মিথ্যা স্বপ্নে ভোটাধিকার যেতে বসেছে হিন্দুদেরই

নিজস্ব সংবাদদাতা, কলকাতা: সিএএ মানেই নাগরিকত্ব, আর নাগরিকত্ব মানেই ভোটাধিকার—এই সরল সমীকরণ বহুদিন ধরেই প্রচার করে এসেছে বিজেপি। কিন্তু সেই প্রচারের ভিত যে বালির উপর দাঁড়িয়ে, তা ফের একবার কার্যত প্রতিষ্ঠা করে দিল সুপ্রিম কোর্ট। নাগরিকত্ব সংশোধনী আইনে (CAA) আবেদন করা ব্যক্তিদের নাগরিকত্ব না পাওয়া পর্যন্ত ভোটার তালিকায় রাখা যাবে না—শীর্ষ আদালতের এই অবস্থানে বিজেপির রাজনৈতিক দাবির মুখোশ আরও স্পষ্ট হয়ে উঠল।

পশ্চিমবঙ্গের ভোটার তালিকার বিশেষ সংশোধন প্রক্রিয়া (SIR) ঘিরে সম্প্রতি সুপ্রিম কোর্টে যে মামলা ওঠে, তার কেন্দ্রে ছিল একটি সহজ কিন্তু অস্বস্তিকর প্রশ্ন—সিএএ-তে আবেদন করলেই কি কেউ ভোটার হওয়ার যোগ্য হয়ে যান? আদালতের উত্তর ছিল স্পষ্টতই ‘না’। এমনকি সিএএ আবেদনকারীদের শরণার্থী হিসেবে ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার আবেদনও গ্রহণ করেনি আদালত।

শুনানিতে সুপ্রিম কোর্ট কার্যত বিজেপির প্রচার-ভাষ্যকে খারিজ করে জানিয়ে দেয়, নাগরিকত্ব কোনও ফর্ম ফিলাপের রসিদ নয়। আবেদনকারীর ধর্মীয় পরিচয়, দেশত্যাগের ইতিহাস, ভারতে বসবাসের নির্দিষ্ট সময়সীমা—সব কিছু সরকারকে খতিয়ে দেখতে হবে। এই যাচাই শেষ না হওয়া পর্যন্ত নাগরিকত্ব নেই, আর নাগরিকত্ব না থাকলে ভোটাধিকারও নেই।

এই বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে প্রশ্ন উঠছে—তাহলে বিজেপি কাদের ভরসা দিয়ে বছরের পর বছর সিএএ-কে ‘নাগরিকত্বের গ্যারান্টি’ বলে বিক্রি করল? রাজ্যের সংখ্যালঘু শরণার্থী অধ্যুষিত এলাকায় সভা-মিছিলে যে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, আদালতের পর্যবেক্ষণ তার সম্পূর্ণ বিপরীত ছবি তুলে ধরছে।

সবচেয়ে বিপজ্জনক দিকটি লুকিয়ে আছে অন্য জায়গায়। যাঁদের নাম আগে থেকেই ভোটার তালিকায় ছিল, তাঁরা সিএএ-তে আবেদন করে এখন নতুন করে নাগরিকত্ব যাচাইয়ের জালে আটকে পড়তে পারেন। আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, এতে উল্টো ভাবে তাঁদের ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়ার আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে। অর্থাৎ যে আইন নাগরিকত্ব দেওয়ার কথা বলে প্রচার করা হয়েছিল, তা-ই ভোটাধিকার হারানোর কারণ হয়ে উঠতে পারে।

সুপ্রিম কোর্ট আগেই জানিয়েছে, আধার কার্ড নাগরিকত্বের প্রমাণ নয়। তবু মাঠের রাজনীতিতে বিজেপি বারবার এমন ধারণা ছড়িয়েছে, যেন সিএএ-র ফর্ম পূরণ করলেই আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত। আদালতের বক্তব্য সেই দাবিকে একের পর এক ধ্বংস করছে।

ফলে আজ প্রশ্ন উঠছে—এ কি শুধু ভুল বোঝাবুঝি, না কি পরিকল্পিত রাজনৈতিক ফাঁদ? নাগরিকত্বের নামে মানুষকে ফর্ম পূরণে উৎসাহিত করে, পরে তাঁদের ভোটাধিকার অনিশ্চিত করে তোলার এই প্রক্রিয়া গণতন্ত্রের পক্ষে কতটা ভয়ংকর?

সুপ্রিম কোর্টের অবস্থান অন্তত একটি সত্য পরিষ্কার করে দিয়েছে—সিএএ কোনও জাদুর কাঠি নয়। কিন্তু সেই সত্য সামনে আসতে আসতেই, বিজেপির প্রচারে ভরসা করা লক্ষ লক্ষ মানুষ আজ অনিশ্চয়তার অন্ধকারে দাঁড়িয়ে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *