পাটনা: ভোটের আর মাত্র ছ’দিন বাকি। তার মধ্যেই নতুন করে প্রতিশ্রুতির বন্যা এনেছে নীতীশ কুমার নেতৃত্বাধীন এনডিএ জোট। শুক্রবার প্রকাশিত ‘সংকল্প পত্রে’ এক কোটি যুবককে চাকরি দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে জোট। সেই সঙ্গে প্রতিটি জেলায় দক্ষতা উন্নয়ন কেন্দ্র, মহিলাদের জন্য বিশেষ ঋণ প্রকল্প ও ৫০ লক্ষ কোটি টাকার বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতিও রাখা হয়েছে নির্বাচনী ইস্তেহারে।
কিন্তু বিরোধীদের অভিযোগ — “পুরনো প্রতিশ্রুতি এখনও ভেসে বেড়াচ্ছে কাগজে কলমে।” ২০২০ সালের নির্বাচনের সময়েও কর্মসংস্থান, শিক্ষা ও শিল্পোন্নয়নের আশ্বাস দিয়েছিলেন নীতিশ কুমার। কিন্তু গত পাঁচ বছরে বাস্তবে চিত্রটা উল্টো।
বিহার বিধানসভা নির্বাচনের আগে এনডিএ-র যৌথ নির্বাচনী ইস্তেহার ‘সংকল্প পত্র’ প্রকাশ করা হয় ২৯ অক্টোবর ২০২৫-এ, পাটনায়। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী নীতীশ কুমার, উপমুখ্যমন্ত্রী সম্রাট চৌধুরী, কেন্দ্রীয় মন্ত্রী গিরিরাজ সিং, এবং রাজ্য বিজেপির সভাপতি সঞ্জয় জয়সওয়াল-সহ জোটের শীর্ষ নেতৃত্ব। যদিও অনুষ্ঠানে অমিত শাহের উপস্থিতি নিয়ে জল্পনা ছিল, তিনি শেষ পর্যন্ত সেখানে উপস্থিত ছিলেন না। ইস্তেহার প্রকাশের সময় নীতীশ কুমার দাবি করেন, “এনডিএ সরকারই বিহারের উন্নয়নের একমাত্র গ্যারান্টি।” অন্যদিকে, বিজেপি নেতৃত্ব বলেন, এই ‘সংকল্প পত্র’ রাজ্যের আগামী পাঁচ বছরের উন্নয়নের রূপরেখা।
রাজ্যের প্রধান বিরোধী নেতা তেজস্বী যাদব বলেন, “নীতিশবাবু এক কোটি চাকরির প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, কিন্তু তাঁর সরকার গত ৫ পছরে এক লাখও চাকরি দিতে পারেনি। দারিদ্র্য ও বেকারত্ব দুই-ই বেড়েছে বিহারে। যুবকরা আজও ভিনরাজ্যে পাড়ি দিচ্ছেন রোজগারের খোঁজে।”
কংগ্রেস নেতা সচিন পাইলটের বক্তব্য, “নীতিশ কুমার বিহারের মানুষকে কর্মসংস্থানের স্বপ্ন দেখিয়েছেন, কিন্তু সেই স্বপ্ন এখনও অধরাই। রাজ্যের অর্থনীতি স্থবির, শিল্পে বিনিয়োগ নেই, ফলে শিক্ষিত যুবকরাও কাজ পাচ্ছেন না।”
সিপিআই(এমএল) নেতা দীপঙ্কর ভট্টাচার্য আরও একধাপ এগিয়ে বলেন, “বিহারে দুই দশক ধরে চলছে চাকরি আর জমি চুরির রাজনীতি। রাজ্য জুড়ে অরাজকতা বাড়ছে। নীতিশ কুমার আসলে বিজেপির পুরনো স্ক্রিপ্টই এখন পড়ে যাচ্ছেন।” তিনি সম্ভবত ২০২১৪ সালে নরেন্দ্র মোদীর, বছরে ২ কোটি চাকরি, কালো টাকা ফিরিয়ে এনে সবার অ্যাকাউন্টে ১৫ লাখ টাকা দেওয়া, কৃষকের আয় দ্বিগুন করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। কিন্তু বাস্তবে সব কিছুই উল্টো হয়েছে। সুইস ব্যাঙ্কে কালো টাকার পরিমান মোদী সরকারের আমলে রেকর্ড ছাড়িয়ে গিয়েছে। কৃষক আত্মহত্যা বেড়েছে। বিগত ৪০ বছরে বেকারত্ব সব থেকে বেশি।
বাস্তব বনাম প্রতিশ্রুতি
সরকারি তথ্য বলছে, ২০২৩–২৪ অর্থবর্ষে বিহারের ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সী তরুণদের মধ্যে বেকারত্বের হার বেড়েছে। বিহারে কর্মসংস্থানের অভাবে অনেকেই কাজের সন্ধানে দিল্লি, গুজরাট ও মহারাষ্ট্রে পাড়ি দিয়েছেন।
নীতিশ সরকারের তরফে অবশ্য দাবি করা হয়েছে, “সংকল্প পত্র” বাস্তবায়নে বিস্তারিত রূপরেখা তৈরি আছে। প্রতিটি জেলায় শিল্পপতি আকর্ষণের পরিকল্পনা, কৃষি ও ক্ষুদ্র উদ্যোগে বিনিয়োগ এবং মহিলাদের জন্য স্বনির্ভরতা কর্মসূচিও নেওয়া হয়েছে।
কিন্তু বিশেষজ্ঞদের মতে, ২০১৫ ও ২০২০ সালের মতো এবারের প্রতিশ্রুতিগুলিও নির্বাচনী প্রচারের হাতিয়ার হিসেবেই থেকে যেতে পারে। বাস্তবিক কর্মসংস্থান না হলে যুবসমাজের হতাশা আরও গভীর হবে।
শেষ প্রশ্নটা থেকে যাচ্ছে, ভোটের ময়দানে প্রতিশ্রুতির ঝলকানি থাকলেও, বিহারের ভোটাররা এবার কি পুরনো অভিজ্ঞতা ভুলে আবার বিশ্বাস রাখবেন নীতিশ কুমারে? নাকি কর্মসংস্থানহীনতার যন্ত্রণা এই নির্বাচনের ফলাফলই বদলে দেবে?
বিহার ভোটের তারিখ
ভোটগ্রহণ দুই ধাপে হবে — প্রথম ধাপ হবে ৬ নভেম্বর ২০২৫ এবং দ্বিতীয় ধাপ ১১ নভেম্বর ২০২৫। ফলাফলের ঘোষণা নির্ধারিত রয়েছে ১৪ নভেম্বর ২০২৫-এ। এই নির্বাচনে ২৪৩টি আসনের জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে। ভোটার সংখ্যা প্রায় ৭.৪ কোটি। ভোটার সুবিধার্থে রাজ্যজুড়ে ৯০,৭১২টি ভোটকেন্দ্র তৈরি করা হয়েছে।