সাদা খাতা জমা দিয়ে বিডিও হওয়ায় অভিক্ত প্রশান্ত বর্মনের বিরুদ্ধে এবার খুনের মামলা!

নিজস্ব সংবাদদাতা, মোহনপুর, ৫ নভেম্বর: সাদা খাতা জমা দিয়ে বিডিও হওয়া প্রশান্ত বর্মনের বিরুদ্ধে এবার স্বর্ণ ব্যবসায়ীকে খুনের অভিযোগ। বর্তমানে তিনি জলপাইগুড়ির রাজগঞ্জের বিডিও। তাঁর বিরুদ্ধে নিউ টাউন এলাকার ব্যবসায়ী স্বপন কামিল্যা (৪৩)-কে খুনের অভিযোগ উঠেছে। স্বপনের বাড়ি পশ্চিম মেদিনীপুরের মোহনপুর ব্লকের বিলমাধিয়া গ্রামে। ব্যবসাসূত্রে ২৫ বছর ধরে সল্টলেকে বসবাস করতেন তিনি। মৃতের পরিবারের তরফে নিউ টাউন থানায় অভিযোগ দায়ের করা হলেও, প্রশান্তকে এখনও গ্রেফতার করা হয়নি।

প্রশান্ত বর্মনের বিরুদ্ধে এর আগে অভিযোগ উঠেছিল— তিনি পিএসসি পরীক্ষায় প্রিলিমে মাত্র ১৩ নম্বর পেয়েছিলেন, কার্যত সাদা খাতা জমা দিয়েছিলেন। পরে মেইন পরীক্ষায় ডাক পান এবং সব ধাপ অতিক্রম করে চাকরিও পেয়ে যান। দুর্নীতি করে চাকরি পাওয়ার অভিযোগে ২০২৩ সাল থেকে বিক্ষোভ, আন্দোলন ও মামলা চলছিল। সেই অবস্থায় এমন এক সরকারি কর্মচারির বিরুদ্ধে খুনের অভিযোগে চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে রাজ্য রাজনীতিতে।

জানা গিয়েছে, প্রশান্ত বর্মনের শিলিগুড়ির মাটিগাড়া এলাকার বাড়ি থেকে সম্প্রতি কিছু সোনার গয়না চুরি যায়। বিষয়টি তদন্ত করতে গিয়ে উঠে আসে— নিউ টাউনের দত্তাবাদের একটি দোকানের মাধ্যমে সেই গয়না বিক্রি হয়েছে। খবর পেয়ে ২৩ অক্টোবর দুটি গাড়ি (যার একটিতে নীল বাতি লাগানো ছিল) নিয়ে দত্তাবাদের স্বপন কামিল্যার সোনার দোকানে হাজির হন প্রশান্ত। দোকানে গিয়ে নিজেকে ‘বিডিও প্রশান্ত বর্মন’ বলে পরিচয় দেন। জানান, তাঁর বাড়ি থেকে সোনার গয়না চুরি হয়েছে, সেই বিষয়েই এসেছেন তিনি। দোকান-মালিক স্বপনের খোঁজ করেন। কিন্তু স্বপন তখন ওড়িশায় অসুস্থ শ্বশুরের কাছে গিয়েছিলেন। দোকান ঘরটির মালিক গোবিন্দ বাগকে দিয়ে ফোন করানো হয় স্বপনের স্ত্রীকে এবং তাঁকে দ্রুত ফিরতে বলা হয়। অভিযোগ, প্রশান্ত দোকান থেকে কিছু সোনার গয়না ও সিসিটিভি ফুটেজ নিয়ে যান।

২৮ অক্টোবর সকালে স্বপন দত্তাবাদের দোকানে ফেরেন। অভিযোগ, দশ মিনিটের মধ্যে প্রশান্ত বর্মনও দুই গাড়ি নিয়ে পৌঁছে যান। সেদিনের ঘটনা বর্ণনা করতে গিয়ে স্বপনের শ্যালক দেবাশিস কামিল্যা জানান, “এক ভদ্রলোক গাড়ি থেকে নেমে নিজেকে বিডিও প্রশান্ত বর্মন বলে পরিচয় দেন এবং কার্যত কোনও কথা না শুনেই স্বপন ও গোবিন্দকে তুলে নিয়ে চলে যান।”

পরে সল্টলেকের নয়াবাদ এলাকায় গোবিন্দকে গাড়ি থেকে নামিয়ে দেওয়া হয়। পরের দিন, ২৯ অক্টোবর সকালে নিউ টাউনের নির্জন খালপাড় এলাকা থেকে একটি ক্ষতবিক্ষত দেহ উদ্ধার হয়। পরে ছবি দেখে সেটি স্বপনের দেহ বলে শনাক্ত করে তাঁর পরিবার। ময়নাতদন্তে জানা যায়, স্বপনকে খুন করা হয়েছে। এরপর ৩১ অক্টোবর মৃতের শ্যালক দেবাশিস বিধাননগর দক্ষিণ থানায় অভিযোগ দায়ের করেন।

ঘটনা প্রকাশ্যে আসতেই মঙ্গলবার সংবাদমাধ্যমের কাছে প্রশান্ত বর্মন বলেন, “আমার কোনও জমিজমা বা বাড়ি নেই। অভিযোগ করা হলেই কি আমি দোষী হয়ে যাব?”

বিধাননগর কমিশনারেট সূত্রে জানা গিয়েছে, কিছুদিন আগে রাজগঞ্জের বিডিও প্রশান্ত বর্মনের শিলিগুড়ির মাটিগাড়া এলাকার বাড়ি থেকে কিছু সোনার গয়না চুরি যায়। তদন্তে পুলিশ জানতে পারে— সল্টলেকের এক স্বর্ণব্যবসায়ীর কাছে চুরি হওয়া গয়না বিক্রি করা হয়েছে। স্থানীয় পুলিশের কাছ থেকে সেই খবরও পেয়ে যান প্রশান্ত। খুনের কারণ এখনও স্পষ্ট নয়, তবে গোটা ঘটনার তদন্ত চলছে।

৪ নভেম্বর মঙ্গলবার নিহতের পরিবারের পক্ষ থেকে সংবাদমাধ্যমে অভিযোগ জানানো হয়। পরিবারের সদস্যদের প্রশ্ন— এতদিন পরেও অভিযুক্তকে গ্রেফতার করা হয়নি কেন? ভাই রতন কামিল্যা বলেন, “দাদাকে খুন করা হয়েছে। আমরা সুবিচার চাই।”

এদিকে স্বামীর শোকে কার্যত অর্ধপাগল হয়ে গেছেন স্বপনের স্ত্রী। তাঁদের দুই নাবালক ছেলে ও মেয়ে রয়েছে। বৃদ্ধ বাবা-মা বাকরুদ্ধ। শুধু গ্রামের মানুষ নয়, সল্টলেকের দোকান ও বাড়ির প্রতিবেশীরাও হতবাক।

দত্তাবাদের দোকানের পাশের বাসিন্দা অনুপ মণ্ডল বলেন, “প্রায় ১৩ বছর ধরে ওকে চিনি। কারও সঙ্গে কোনও বিবাদ দেখিনি। এত শান্ত, নম্র মানুষকে কেন খুন করা হল, বুঝতে পারছি না।”

মৃত স্বপনের গোটা গ্রাম ক্ষোভে ফুঁসছে। দোষীদের দ্রুত গ্রেফতার করে কঠোর শাস্তির দাবি তুলেছেন স্থানীয়রা। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রশাসন কী পদক্ষেপ নেয়, সে দিকেই তাকিয়ে গ্রামের মানুষ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *