মার্কিন ডিপার্টমেন্ট অব জাস্টিস (DOJ) প্রকাশিত এপস্টিন ফাইলস ঘিরে আন্তর্জাতিক মহলে যখন তোলপাড়, তখন সেই নথিতেই একাধিক বার উঠে এসেছে ভারতের শিল্পপতি অনিল আম্বানির নাম। স্বাভাবিক ভাবেই প্রশ্ন উঠছে—জেফ্রি এপস্টিনের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগের প্রকৃতি আসলে কী ছিল?
প্রকাশিত সরকারি নথি, উদ্ধার হওয়া ইমেল ও সংবাদমাধ্যমের অনুসন্ধান অনুযায়ী, ২০১৭ থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে অনিল আম্বানি ও জেফ্রি এপস্টিনের মধ্যে একাধিক বার যোগাযোগ হয়েছিল। মূলত ব্যবসায়িক নেটওয়ার্কিং, প্রভাবশালী মহলে যোগাযোগ স্থাপন এবং আর্থিক পরামর্শ ঘিরেই এই যোগাযোগ আবর্তিত ছিল বলে নথিতে ইঙ্গিত।
নথি বলছে, ২০১৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে দু’জনের প্রথম পরিচয় করিয়ে দেন দুবাইয়ের শিল্পপতি সুলতান আহমেদ বিন সুলায়েম। সেই পরিচয়ের পরেই ইমেল আদান-প্রদানের মাধ্যমে সৌজন্যমূলক সম্পর্ক গড়ে ওঠে। পরবর্তী সময়ে যোগাযোগ বজায় রাখার কথাও লেখা হয়েছিল বার্তায়।
এর পরের মাসেই, অর্থাৎ ২০১৭ সালের মার্চে, অনিল আম্বানি এক ইমেলে এপস্টিনকে জানান, তিনি যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন ক্ষমতাকেন্দ্রের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের—বিশেষ করে জ্যারেড কুশনার ও স্টিভ ব্যানন—সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে আগ্রহী এবং সেই ক্ষেত্রে এপস্টিনের সহায্য চান। ওই বার্তায় “Leadership would like your help” জাতীয় শব্দ ব্যবহৃত হয়, যা থেকে স্পষ্ট হয়, এপস্টিন নিজেকে এক ধরনের প্রভাবশালী যোগাযোগ-স্থাপনকারী হিসেবেই তুলে ধরছিলেন।
নথি অনুযায়ী, এপস্টিন বিভিন্ন সময়ে অনিল আম্বানিকে নিউ ইয়র্কে বৈঠকের আমন্ত্রণ জানান। এমনকি ক্যারিবিয়ান সাগরে নিজের ব্যক্তিগত দ্বীপে যাওয়ার প্রস্তাবও দেন। যদিও প্রকাশিত কোনও নথিতেই এমন প্রমাণ নেই যে অনিল আম্বানি কখনও সেই দ্বীপে গিয়েছিলেন।
সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে ২৩ মে ২০১৯। DOJ উদ্ধার করা ডিভাইসের ক্যালেন্ডার ও ইমেল থেকে জানা যাচ্ছে, ওই দিন নিউ ইয়র্কে এপস্টিন ও অনিল আম্বানির সাক্ষাৎ হয়েছিল। একই রাতে এপস্টিন অন্যদের কাছে ‘মোদি সংক্রান্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক’-এর কথা উল্লেখ করেন।
এই সময় পর্বেই অনিল আম্বানির ব্যক্তিগত ও ব্যবসায়িক জীবনে বড় ধরনের সংকট চলছিল। ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, সুপ্রিম কোর্ট এরিকসন মামলায় তাঁকে ও রিলায়েন্স কমিউনিকেশন্সের দুই পরিচালককে আদালত অবমাননার দায়ে দোষী সাব্যস্ত করে। চার সপ্তাহের মধ্যে ৪৫৩ কোটি টাকা মেটানোর নির্দেশ দেয় আদালত—না হলে জেলের হুঁশিয়ারি। শেষ পর্যন্ত এই টাকা মেটান তাঁর দাদা মুকেশ আম্বানি। এই মামলাকেই অনিল আম্বানির আর্থিক বিপর্যয়ের সূচনা হিসেবে ধরা হয়। পরের বছরই ব্রিটিশ আদালতে তিনি নিজেকে দেউলিয়া ঘোষণা করেন।
এই সংকটের মধ্যেই এপস্টিন অনিল আম্বানির সঙ্গে যোগাযোগ রেখে চলেছিলেন। ১১ মার্চ ২০১৯-এ এপস্টিন তাঁকে লেখেন, “Stay mentally strong. Make sure you get enough sleep…”—অর্থাৎ মানসিক ভাবে দৃঢ় থাকার পরামর্শ দেন। কয়েক দিন ধরে তিনি নিয়মিত খোঁজ নেন, কোনও সাহায্য প্রয়োজন কি না।
এই সময়েই অনিল আম্বানি এপস্টিনের কাছে প্রায় ৭৫০ মিলিয়ন ডলার ঋণ তোলার বিষয়ে সহায়তা চান। ইমেল অনুযায়ী, একটি ব্যক্তিগত ঋণকে শেয়ার বন্ধক রেখে কর্পোরেট কাঠামোর আড়ালে রাখার পরিকল্পনা নিয়েও এপস্টিনের পরামর্শ চাওয়া হয়েছিল। যদিও এপস্টিন সরাসরি সেই পথ নিতে মানা করেন এবং কর ও প্রকাশ্য ঘোষণার ঝুঁকি নিয়ে সতর্ক করেন।
এই আর্থিক আলোচনার প্রেক্ষিতেই ২৩ মে ২০১৯ নিউ ইয়র্কে কফির টেবিলে তাঁদের সাক্ষাৎ হওয়ার কথা স্থির হয়। ২ মে-র এক ইমেলে এপস্টিন লেখেন, তিনি ওই দিন সময় দেবেন “only as a friend”। উত্তরে অনিল আম্বানি লেখেন, “Transaction done. Will come to say Hello and have coffee.” কিন্তু এই ‘Transaction’ আসলে কী ছিল, তা নথিতে স্পষ্ট নয়।
নথি বলছে, এই বৈঠককে পরে এপস্টিন নিজের প্রভাব বাড়ানোর হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেন। ১৯ মে ২০১৯-এ তিনি স্টিভ ব্যাননকে লেখেন, “modi sending someone to see me on thurs.” ২৩ মে-র দিন এপস্টিনের ক্যালেন্ডারে একমাত্র বৈঠক ছিল অনিল আম্বানির সঙ্গে। বৈঠকের পরে ব্যাননকে তিনি জানান, এটি ছিল “really interesting modi meeting” এবং সেখানে ভারতের চীন ও পাকিস্তান সংক্রান্ত দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে আলোচনা হয়েছে বলেও দাবি করেন।
একই সময়ে এপস্টিন অনিল আম্বানিকেও বার্তা পাঠান, স্টিভ ব্যাননের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী মোদির সাক্ষাৎ হওয়া উচিত। অনিল আম্বানি “sure” লিখে সম্মতি জানান। তবে বাস্তবে তিনি প্রধানমন্ত্রী বা সরকারের পক্ষ থেকে এমন কোনও প্রতিশ্রুতি দেওয়ার অবস্থায় ছিলেন কি না, তা স্পষ্ট নয়। পরে ভারত সরকার এই ধরনের ধারণাকে সম্পূর্ণ নাকচ করে দেয়।
এই সময় অনিল আম্বানির বিরুদ্ধে রাফালে যুদ্ধবিমান চুক্তি ঘিরেও রাজনৈতিক বিতর্ক চলছিল। কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন বিরোধীদের দুর্নীতির অভিযোগের প্রসঙ্গও এপস্টিনের সঙ্গে কথোপকথনে উঠে আসে।
নথিতে আরও দেখা যায়, এপস্টিন অনিল আম্বানির সঙ্গে এক ধরনের ফিক্সার–ক্লায়েন্ট সম্পর্ক গড়ে তুলতে চাইছিলেন। তিনি একাধিক প্রভাবশালী ব্যক্তির সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার প্রস্তাব দেন—যার মধ্যে ছিলেন ইহুদ বারাক, পিটার থিয়েল, টম প্রিটজকার, প্রাক্তন সিআইএ প্রধান বিল বার্নস এবং নরওয়েজিয়ান কূটনীতিক তেরিয়ে রড-লারসেন। বিল বার্নসের সঙ্গে অনিল আম্বানির ২০১৭ সালের এপ্রিল মাসে মুম্বইয়ে সাক্ষাৎ হওয়ার কথাও নথিতে রয়েছে।
ব্যক্তিগত ঘনিষ্ঠতার চেষ্টাও কম ছিল না। এপস্টিন অনিল আম্বানির কাছ থেকে কোকিলাবেন আম্বানির লেখা ধীরুভাই আম্বানির জীবনী চান, প্রশংসাপত্র লেখেন এবং নিউ ইয়র্কে পড়ুয়া তাঁর ছেলের দিকেও নজর রাখার প্রস্তাব দেন। তবে ২০১৭ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি ক্যারিবিয়ান দ্বীপে যাওয়ার আমন্ত্রণ জানালেও, সেই আমন্ত্রণ গ্রহণের কোনও প্রমাণ মেলেনি।
সব মিলিয়ে, এপস্টিন ফাইলস অনিল আম্বানি ও জেফ্রি এপস্টিনের মধ্যে একটি জটিল কিন্তু নথিভুক্ত যোগাযোগের ছবি তুলে ধরে। যেখানে ব্যবসায়িক সংকট, রাজনৈতিক চাপ, আর্থিক পরামর্শ ও প্রভাবশালী মহলে প্রবেশের চেষ্টা একে অপরের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে। তবে এখনও পর্যন্ত প্রকাশিত নথিতে এমন কোনও প্রমাণ নেই, যার ভিত্তিতে বলা যায় যে অনিল আম্বানি এপস্টিনের যৌন অপরাধ বা মানব পাচারের সঙ্গে কোনও ভাবে যুক্ত ছিলেন।
আর সেই রহস্যময় ‘Transaction’—তা ঠিক কী ছিল, সে প্রশ্নের উত্তর এখনও অধরাই।