চিকিৎসায় গাফলতিতে প্রসূতির মৃত্যুর অভিযোগ মেদিনীপুর মেডিক্যাল কলেজে

নিজস্ব সংবাদদাতা, মেদিনীপুর, ১৩ অক্টোবর: আবারও মেদিনীপুর মেডিকেলে প্রসূতির মৃত্যু। মেদিনীপুর মেডিক্যাল কলেজের বিরুদ্ধে বিস্ফোরক অভিযোগ পরিবারের। ভর্তি না নিয়ে মাঝরাতে প্রসূতিকে ফেরত পাঠিয়ে দেওয়ার ঘটনা। কিছুক্ষণের মধ্যে আবারো অসুস্থ হয়ে পড়ায় হাসপাতালে নিয়ে এলে চিকিৎসায় দেরী করায় ভোর রাতে মৃত্যু হয় সেই প্রসূতির। হাসপাতালের সিসিইউ ওয়ার্ডের সামনে তীব্র বিক্ষোভ মৃতার পরিবারের। চুড়ান্ত গাফিলতির অভিযোগ পরিবারের।

পশ্চিম মেদিনীপুরের বেলদা থানার নাহাপার গ্রামের বাসিন্দা মৃতার স্বামী পবিত্র দাস বলেন, রবিবার হলে যে ডাক্তার পাওয়া অনিশ্চিত তার জানা ছিলো না। এমনিতে মেদিনীপুর মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের মতো জেলা শহরের হাসপাতালে রোগীর চাপ। প্রতিদিনই ৪০০-৬০০ জন ভর্তি হয়। শূন্যপদ ৬০ ভাগ। জুনিয়র চিকিৎসক সহ পড়ুয়া চিকিৎসক দের উপর ভরসা করে হাসপাতাল গড়ছে।


পবিত্র দাস বলেন, তাঁর স্ত্রী ৯ মাসের অন্তঃসত্ত্বা। হঠাৎ করে রবিবার সন্ধ্যায় শ্বাসকষ্ট শুরু হয়। অসুস্থ হয়ে পড়ায় মেদিনীপুর মেডিকেলে নিয়ে আসেন। চিকিৎসা না পেয়ে তার স্ত্রীর মৃত্যু অভিযোগ তুলে ক্ষোভ উগরে দেন। সন্ধ্যা ৬টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত প্রসূতি ওয়ার্ড হয়ে মেডিসিন ওয়ার্ড ঘুরিয়ে তারপরও ভর্তি না নিয়ে রাতে ছেড়ে দেওয়া হয়। এত রাতে বাড়ি না ফিরে পরের দিন সোমবার কোনেও চিকিৎসক কে দেখানোর আশায় প্রসূতিকে আর জার্নি না করিয়ে একটি আবসনের রুম ভাড়া নিয়ে রাত কাটানোর সিদ্ধান্ত নেন। এমন সময় ফের শ্বাসকষ্ট শুরু হয়। পুনরায় অসুস্থ হয়ে পড়ায় আবারেও মেদিনীপুর মেডিকেলে জরুরি বিভাগে নিয়ে আসে রোগীকে। হাসপাতালে নিয়ে এলে চিকিৎসায় দেরী করায় ভোর রাতে মৃত্যু হয় সেই প্রসূতির।

এই মেদিনীপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে জানুয়ারী মাসে রিঙ্গার্স ল্যাকটেট জাল সেলাইন কাণ্ডে একদিনেই ৮ জন প্রসূতি অসুস্থ হয়ে কোমায় চলে যাওয়ার ঘটনা ঘটেছিলো। প্রথম দিনেই ২ জন প্রসূতি সহ এক শিশুর মৃত্যু হয়। পরে কলকাতায় আরোও একজনের মৃত্যু হয়। বাকীরা প্রানে বাঁচলেও সেই প্রসূতি মায়েরা এখন নানান রোগ জ্বালায় দূর্বল শরীর নিয়ে বাড়ীতে কর্ম ক্ষমতা হারিয়ে বসবাস করেন।

সোমবার ভোরে মেদিনীপুর মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালে মারা যান ৯ মাসের অন্তঃসত্ত্বার নাম শিখা দে দাস (৩২)। ওই ঘটনায় হাসপাতালের সিসিইউ ওয়ার্ডের বাইরে বিক্ষোভ দেখিয়েছেন মৃতার পরিবার। তাদের অভিযোগ, চিকিৎসার গাফিলতিতে মারা গিয়েছেন শিখা।
পরিবারের অভিযোগ শ্বাসকষ্ট হওয়ায় রবিবার সন্ধ্যা ৬টা নাগাদ হাসপাতালে নিয়ে আসা হয়েছিল। ইমার্জেন্সিতে দেখানোর পরে মাতৃমা বিভাগে নিয়ে যাওয়া হয়। স্বামী পবিত্র দাস বলেন, প্রসূতি বিভাগে এক দের ঘন্টার পর তাঁর স্ত্রীকে মেডিসিন ওয়ার্ডে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। সেখানেও ঘন্টা দুয়েক স্ট্রেচারে শুইয়ে রেখে আর ভর্তি নেওয়া হয়নি। রাত ১০ টা নাগাদ জ্বর ও কাশির ওষুধ দিয়ে তাঁকে ছেড়ে দেওয়া হয়। রাতে একটি আবাসনে রুম ভাড়া নিয়ে থাকার কিছু ক্ষনের মধ্যে আবারো শ্বাসকষ্ট সহ অসুস্থ হয়ে পড়ে। আবারো ইমার্জেন্সিতে নিয়ে আসা হয়েছিল। ফের মাতৃমা প্রসূতি বিভাগে পাঠানো হয়। রাত তিনটা পর্যন্ত কোনো চিকিৎসা হয় নি বলে পরিবারের অভিযোগ। অবস্থার অবনতি হলে ভোর পাঁচটা নাগাদ সিসিইউ-তে পাঠানো হয়। তারপরে সোমবার ভোর ৬টা নাগাদ মারা যায়। পবিত্রের অভিযোগ, ভুল চিকিৎসার কারণে প্রান চলে গেলো। তিনি বলেন ‘মৃত্যুর কারণ না জানানো পর্যন্ত দেহ নেবো না। তাই সকাল থেকে বিকাল পর্যন্ত মর্গের সামনেই বসে ছিলেন পরিবার।
পরিবারের পক্ষ থেকে মেডিক্যাল কলেজের সুপার ও জেলা মুখ্য স্বাস্থ্য আধিকারিকের কাছে অভিযোগ জমা পড়েছে। সোমবারই গোটা বিষয়টি নিয়ে আলোচনায় বসেছিলেন জেলার মুখ্য স্বাস্থ্য অধিকারিক, মেডিক্যাল কলেজের সুপার, অ্যাসিস্ট্যান্ট সুপারদের নিয়ে হয়েছে বৈঠক। প্রশাসন সূত্রের খবর, রাজ্য স্বাস্থ্য দপ্তর থেকে আসছেন দুই সদস্যের প্রতিনিধিদল, তাঁরা বিষয়টি খতিয়ে দেখবেন। স্বাস্থ্য দপ্তরের তরফে চার সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। ৩ জন স্বাস্থ্য ভবনের তরফে থাকবেন এবং আরও একজন জেলা প্রশাসনের তরফে থাকবেন। এছাড়া, মেদিনীপুর মেডিক্যাল কলেজের তরফেও গঠন করা হয়েছে তদন্ত কমিটি। মেডিক্যাল কলেজের সুপার ইন্দ্রনীল সেন বলেন, ‘আমরা তদন্ত কমিটি গড়ে পুরো বিষয়টি খতিয়ে দেখছি। ময়নাতদন্তের রিপোর্ট পাওয়ার পরে বিষয়টি স্পষ্ট হবে। জেলা মুখ্য স্বাস্থ্য অধিকারিক সৌম্যশঙ্কর ষড়ঙ্গী বলেন, ‘আমার কাছে পরিবারের তরফে অভিযোগ জমা পড়েছে। তদন্ত কমিটি গড়া হয়েছে। রাজ্য থেকে দুই সদস্যের প্রতিনিধি দল আসছে। আমরা পুরো বিষয়টি খতিয়ে দেখছি।’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *