বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী ও বহুলপ্রচারিত সংবাদপত্র দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস-এর সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে ভারতের ধর্মনিরপেক্ষতা ও ‘বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্য’-র ঐতিহাসিক ভিত্তিকে কী ভাবে আরএসএস ও বিজেপি পরিকল্পিত ভাবে ধ্বংস করার পথে এগোচ্ছে, তারই নগ্ন ছবি তুলে ধরা হয়েছে। এই প্রতিবেদন ঘিরে ভারত ছাড়াও ইউরোপ, আমেরিকা ও অস্ট্রেলিয়া-সহ বিভিন্ন দেশ, মহাদেশে ভারতের বর্তমান সরকারের বিরুদ্ধে আরও একবার তীব্র সমালোচনা ও প্রতিক্রিয়া শুরু হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভারতের রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ (আরএসএস) কেবল একটি সাংস্কৃতিক সংগঠন নয়, বরং এটি একটি হিন্দুত্ব-ভিত্তিক রাজনৈতিক আদর্শের কেন্দ্রবিন্দু। যার প্রভাব ১৯২৫ সাল থেকে আজ পর্যন্ত ভারতের সমাজভাবনা ও রাজনৈতিক চরিত্রকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে।
নিউ ইয়র্ক টাইমস-এর প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে—
- আরএসএস একটি তথাকথিত “ছায়া শক্তি” বা shadowy cabal হিসেবে আত্মপ্রকাশ করলেও বর্তমানে ভারতের রাজনীতি, বিচারব্যবস্থা, আমলাতন্ত্র, সেনাবাহিনী এবং সামাজিক পরিসরে ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করেছে। এই উদ্দেশ্যে দেশজুড়ে প্রায় ২,০০০-র বেশি শাখা ও সহযোগী সংগঠন গড়ে তোলা হয়েছে।
- আরএসএস-এর শাখা সংগঠনগুলি শিক্ষা, সমাজসেবা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের আড়ালে তাদের হিন্দুত্ববাদী আদর্শ ছড়িয়ে দিচ্ছে, যা ক্রমশ রাষ্ট্রীয় কাঠামোর ভিতরে প্রোথিত হয়ে পড়ছে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।
- প্রধানমন্ত্রী-সহ শীর্ষ রাজনৈতিক নেতারা নিজেদের আরএসএস-এর ‘শিষ্য’ হিসেবে তুলে ধরছেন। এর ফলে দল ও রাষ্ট্রের মধ্যে গভীর আদর্শিক সংযোগ এবং রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণের সম্পর্ক গড়ে তোলার প্রচেষ্টা স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
নিশ্চিতভাবেই এটি কেবল একটি সংবাদ প্রতিবেদন নয় বরং ভারতের মতো একটি ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রের সামনে এক গভীর রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ। যখন আন্তর্জাতিক সাংবাদিকতার অন্যতম প্রধান প্রতিষ্ঠান নিউ ইয়র্ক টাইমস এই ধরনের উদ্বেগ প্রকাশ করে, তখন তাকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েই দেখছে দেশ ও বিদেশের রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক মহল।
নরেন্দ্র মোদীর সরকারের শুরু থেকেই ভারতের আত্মা তথা ধর্মনিরপেক্ষ চরিত্রকে ক্ষুণ্ণ করার যে ধারাবাহিক চেষ্টা আরএসএস ও বিজেপি চালিয়ে যাচ্ছে, তা সিপিআইএম, কংগ্রেসের মতো ধর্মনিরপেক্ষ শক্তিগুলি বারবার উল্লেখ করেছে। একই সঙ্গে এই প্রবণতা রাষ্ট্রের ঐক্য ও গণতান্ত্রিক কাঠামোর পক্ষে কতটা বিপজ্জনক, তাও বারবার মানুষের সামনে তুলে ধরা হয়েছে।
দলগুলির দাবি, ২০১৪ ও ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে বিজেপি ভাল ফল করলেও ২০২৪-এর নির্বাচনে দেশের মানুষ বাম-কংগ্রেসের এই যুক্তির সঙ্গে সহমত পোষণ করেছেন। বিরোধীদের অভিযোগ, নির্বাচন কমিশনকে ব্যবহার করে ‘ভোট চুরি’ না হলে বিজেপি ১০০-র বেশি আসন পেত না। নির্বাচনের পর প্রকাশ্যে আসা বিভিন্ন পরিসংখ্যান ও তথ্য থেকে এই অভিযোগ যে আংশিক হলেও সত্য, তা স্পষ্ট হচ্ছে।
এই প্রসঙ্গে পশ্চিম মেদিনীপুর জেলা সিপিআইএম সম্পাদক বিজয় পালের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন,
“আমাদের দেশ বহু ধর্ম, বর্ণ, জাতি, ভাষা ও সংস্কৃতির সুতোয় বোনা এক শক্তিশালী রাষ্ট্র। দেশের শিক্ষা, সংস্কৃতি ও বিজ্ঞান—সব কিছুই এই বহুত্ববাদের মজবুত ভিত্তির উপর দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু বিজেপি ও আরএসএস সেই মূল ভিত্তি—ধর্মনিরপেক্ষতা, স্বাধীন গণতান্ত্রিক অধিকার ও বহুত্ববাদ—ধ্বংস করে ঘৃণার রাজনীতি ছড়িয়ে দেশকে টুকরো টুকরো করতে চাইছে।”
বিজয় পাল আরও বলেন, “একটি সমৃদ্ধ ও এগিয়ে থাকা জাতিকে তারা একটি ধর্মসর্বস্ব রাষ্ট্রে পরিণত করতে চাইছে। পাকিস্তান, বর্তমান বাংলাদেশ কিংবা তালিবান শাসিত আফগানিস্তানের অভিজ্ঞতা কি আমরা দেখিনি—ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্র কী ভাবে সমৃদ্ধি থেকে ধ্বংসের পথে এগিয়ে যায়। তাহলে প্রশ্ন ওঠে, বিজেপি ও আরএসএস কেন এই পথ বেছে নিচ্ছে? তারা কি সত্যিই হিন্দুদের ভাল চায়? না। তাদের আসল লক্ষ্য, নানা ভাবে বিভাজনের রাজনীতি কে হাতিয়ার করে অতি ধনীদের (কর্পোরেটদের) স্বার্থ রক্ষা করা। এই কাজ সম্পূর্ণ করতে তারা ভারতকে ধর্মাশ্রয়ী রাষ্ট্রে পরিণত করতে চায়, বাস্তবে যার সঙ্গে ধর্মাচরণের কোনও সম্পর্ক নেই।”