মুখোশ খুলে মুখ দেখাচ্ছে বিজেপি? ১০০ দিনের কাজের আইন বদলে জমিদারি ফেরানোর চেষ্টা! নিন্দায় সিপিআই(এম)

নিজস্ব প্রতিবেদন: ১০০ দিনের কাজ বা মহাত্মা গান্ধি ন্যাশনাল রুরাল এমপ্লয়মেন্ট গ্যারান্টি অ্যাক্ট (MGNREGA) পরিবর্তন করে নতুন একটি প্রকল্প আনতে চাইছে কেন্দ্রের বিজেপি সরকার। যার নাম রাখা হয়েছে ‘বিকশিত ভারত রোজগার ও আজীবিকা মিশন (গ্রামীণ) বিল ২০২৫’, সংক্ষেপে ভিবি-জি-রামজি। জনবিরোধী আখ্যা দিয়ে এই বিলের তীব্র বিরোধিতা করেছে সিপিআই(এম)-এর পলিটব্যুরো ও রাজ্য কমিটি। সোমবারই এই বিলের তীব্র সমালোচনা করে বিবৃতি জারি করা হয়েছে সিপিআই(এম)-এর তরফে।

গান্ধির নাম সরিয়ে রামের নাম ঢোকানো এবং বিল পেশ নিয়েও নাটক করেছে বিজেপি সরকার। নিয়ম অনুযায়ী কোনও বিল পেশের আগের রাতেই সাংসদদের হাতে তার কপি পৌঁছে দেওয়ার কথা। কিন্তু সোমবার দুপুরে হঠাৎ অতিরিক্ত কার্যসূচির তালিকায় বিলটিকে ঢুকিয়ে পেশের চেষ্টা করা হয়। সিপিআই(এম)-সহ বিরোধী দলগুলি এমনকি এনডিএ শরিক টিডিপি-ও এই বিলের তীব্র বিরোধিতা করেছে।

কর্মদিবস ১০০ থেকে বাড়িয়ে ১২৫ দিন করার কথা বলা হলেও, আসলে যে তা চোখে ধুলো দেওয়ার চেষ্টা, তা সিপিআই(এম)-এর জারি করা বিবৃতি থেকেই স্পষ্ট। প্রস্তাবিত নতুন বিলটি এমজিএনআরইজিএ-র মৌলিক চরিত্রকে সম্পূর্ণরূপে অস্বীকার করে। এমজিএনআরইজিএ একটি সর্বজনীন, চাহিদাভিত্তিক আইন, যা সীমিত হলেও কাজের অধিকার নিশ্চিত করে। নতুন বিলটি আইনত কেন্দ্রীয় সরকারকে চাহিদা অনুযায়ী তহবিল বরাদ্দের দায় থেকে অব্যাহতি দিচ্ছে।

১০০ দিন থেকে ১২৫ দিন নিশ্চিত কর্মসংস্থান বৃদ্ধির সরকারের দাবি কেবলই প্রহসনমূলক। কারণ বিলে অর্থ বরাদ্দ বা মজুরি বৃদ্ধির কোনও উল্লেখ নেই। তা ছাড়া বিজেপি সরকার ১০০ দিনের কাজ দেওয়ার ক্ষেত্রেই ব্যর্থ—সেখানে তারা কীভাবে ১২৫ দিনের কথা বলে, সেই প্রশ্ন উঠছে।

নতুন বিলে জব কার্ডের ‘যৌক্তিকীকরণ’-এর নামে গ্রামীণ পরিবারের বড় অংশকে বাদ দেওয়ার দরজা খুলে দেওয়া হয়েছে। কৃষি মরসুমে সরকারকে ৬০ দিন পর্যন্ত কর্মসংস্থান স্থগিত রাখার অনুমতি দেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে, যা গ্রামের মানুষের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজনের সময়েই তাঁদের কাজ থেকে বঞ্চিত করবে। শুধু তাই নয়, গ্রামীণ মানুষদের কার্যত তথাকথিত জমিদারদের উপর নির্ভরশীল করে তোলার পথ তৈরি করা হচ্ছে।

কাজ পাওয়ার ক্ষেত্রে ডিজিটাল উপস্থিতি বাধ্যতামূলক করার ফলে গ্রামের সাধারণ, অল্পশিক্ষিত বা অশিক্ষিত শ্রমিকদের জন্য বড় বাধা তৈরি হবে। এর ফলে শেষ পর্যন্ত তাঁরা কাজের অধিকার থেকেই বঞ্চিত হবেন।

আরও একটি বড় উদ্বেগের বিষয় হল—কাজের টাকা কে দেবে? আগে ১০০ শতাংশ অর্থের দায় ছিল কেন্দ্রের। এখন সেটিকে ৬০:৪০ অনুপাতে কেন্দ্র ও রাজ্যের মধ্যে ভাগ করার প্রস্তাব রাখা হয়েছে। এর ফলে রাজ্যগুলিকে সমস্যায় ফেলা হবে এবং সময় মতো মজুরি না পাওয়ার ঘটনা আরও বাড়বে। এই ব্যবস্থার মাধ্যমে কেন্দ্র নিজের দায় ঝেড়ে ফেলতে চাইছে বলেই অভিযোগ সিপিআই(এম)-এর।

প্রকল্পের নাম মনরেগা থেকে জি-রামজি-তে পরিবর্তনের প্রস্তাবকেও ভয়াবহ বলে মন্তব্য করেছে সিপিআই(এম)।

শুধু সমালোচনাই নয়, সিপিআই(এম)-এর বিবৃতিতে গঠনমূলক প্রস্তাবও রাখা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, ভিবি-জি-রামজি বিল অবিলম্বে প্রত্যাহার করা হোক। কেন্দ্রীয় সরকার বরং সব রাজনৈতিক দল, ট্রেড ইউনিয়ন এবং গ্রামীণ দরিদ্র মানুষের সংগঠনগুলির সঙ্গে পরামর্শ করে এমজিএনআরইজিএ-কে আরও শক্তিশালী করুক এবং সার্বজনীন ও অধিকারভিত্তিক কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা হিসেবে এর কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করুক।

গোটা বিষয়টি সম্পর্কে সিপিআই(এম) পশ্চিম মেদিনীপুর জেলা সম্পাদক বিজয় পাল জানিয়েছেন, কেন্দ্রের বিজেপি সরকারের কোনও দিনই সদিচ্ছা ছিল না ১০০ দিনের কাজের প্রকল্প চালানোর ক্ষেত্রে। পশ্চিমবঙ্গে টাকা আটকে রাখার অভিযোগ যেমন সত্যি, তেমনই বিজেপি-শাসিত রাজ্যগুলিতেও কেন ১০০ দিনের কাজের টাকা আটকে রাখা হয়েছে—সেই প্রশ্ন তোলেন তিনি। তাঁর দাবি, বিজেপি চায় না গ্রামের গরিব মানুষ আত্মনির্ভর হোক। বরং তাঁরা যত গরিব থাকবেন, ততই আদানি-আম্বানিদের মতো কর্পোরেট সংস্থাগুলি কম দামে শ্রমিক পাবে।

বিজয় পালের অভিযোগ, বিজেপি-আরএসএস সরকার মানুষের ভোট নিয়ে পুঁজিপতিদের দালালি করতেই দেশের আইন ও সংবিধান বদলাতে চাইছে। জিএসটির নামে লক্ষ লক্ষ কোটি টাকা লুট করে সামাজিক প্রকল্প বন্ধ করে কর্পোরেটদের সুবিধা করে দিতে চাইছে মোদি-অমিত শাহ। এর বিরুদ্ধেই লাল ঝান্ডার লড়াই আরও শক্ত করতে হবে। মানুষ বিষয়টি বুঝতে পারছেন বলেই মাঠে-ময়দানে এবং ভোটের বাক্সে আরএসএস-এর ‘দুই ফুল’-এর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াচ্ছেন। গান্ধিজির নাম পরিবর্তন করে রামের নাম ঢোকানো নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তিনি,—এই ‘রাম’ রামচন্দ্র, না কি নাথুরাম—তা স্পষ্ট করুক কেন্দ্র।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *