নিজস্ব প্রতিবেদন: ইলেক্টোরাল বন্ড বা নির্বাচনী বন্ডের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা তুলেছে বিজেপি—এই অভিযোগ নতুন নয়। তবে এবার কেন্দ্রীয় সরকারের একাধিক প্রকল্পের নাম ব্যবহার করে বিজেপির পার্টি ফান্ডে টাকা তোলার বিস্ফোরক তথ্য সামনে এল তথ্য জানার অধিকার (RTI)-এর উত্তরে।
বিরোধীদের অভিযোগ, পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূল কংগ্রেস সরকার এবং দেশে বিজেপির কেন্দ্রীয় সরকার সবচেয়ে বড় দুর্নীতিবাজে পরিণত হয়েছে। সরকারি প্রকল্পের নামে বিজেপির পার্টি ফান্ডে টাকা ঢোকার তথ্য সামনে আসতেই দেশের রাজনৈতিক অর্থায়ন ব্যবস্থা, তার স্বচ্ছতা ও নৈতিকতা নিয়ে নতুন করে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে।
সম্প্রতি সাংবাদিক বি আর আরবিন্দাক্ষণের দায়ের করা একটি RTI থেকে জানা গিয়েছে, ২০২১ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বিজেপি কেন্দ্রীয় সরকারি অফিসিয়াল প্ল্যাটফর্ম—যেমন NaMo অ্যাপ এবং narendramodi.in—এর মাধ্যমে রাজনৈতিক অনুদান সংগ্রহ করেছে। এই অনুদান সংগ্রহ করা হয়েছে Swachh Bharat, Beti Bachao Beti Padhao এবং Kisan Seva-র মতো জনপ্রিয় সরকারি প্রকল্পের নাম ব্যবহার করে।
কী ভাবে এই ‘চুরি’?
সরকারি অ্যাপ ও ওয়েবসাইটগুলি সাধারণ মানুষের কাছে উন্নয়নের হাতিয়ার হিসেবেই পরিচিত। সেই বিশ্বাসকে কাজে লাগিয়ে বিজেপি সাধারণ মানুষ, ব্যবসায়ী ও কর্পোরেট সংস্থার কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহ করেছে। দাতারা ভেবেছিলেন, সরকারি অ্যাপ বা ওয়েবসাইটের মাধ্যমে দেওয়া টাকা সরাসরি সরকারি কোষাগারে যাবে এবং তা জনকল্যাণমূলক কাজে ব্যবহৃত হবে। কিন্তু বাস্তবে সেই অর্থ জমা পড়েছে বিজেপির পার্টি ফান্ডে।
RTI-এর উত্তরে নারী ও শিশুকল্যাণ মন্ত্রক, জলশক্তি মন্ত্রক-সহ একাধিক কেন্দ্রীয় মন্ত্রক স্পষ্ট জানিয়েছে, তারা কখনওই সরকারি প্রকল্পের নামে বিজেপিকে অর্থ সংগ্রহের কোনও অনুমতি দেয়নি। আরও চাঞ্চল্যকর তথ্য, প্রধানমন্ত্রী দপ্তর (PMO) জানিয়েছে—NaMo অ্যাপে থাকা এই ‘প্রকল্পভিত্তিক ডোনেশন অপশন’ সম্পর্কে তাদের কাছে কোনও তথ্যই নেই। অর্থাৎ যেসব প্রকল্পের নাম ব্যবহার করে টাকা তোলা হয়েছে, সেই প্রকল্পগুলিই জানত না যে তাদের নামেই রাজনৈতিক অনুদান সংগ্রহ করা হচ্ছে।
এই ঘটনায় স্বাভাবিকভাবেই সন্দেহ আরও ঘনীভূত হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করতেই সরকারি প্রকল্পগুলির নাম ব্যবহার করা হয়েছিল, যাতে দাতাদের মনে হয় তাঁদের টাকা সরকারি উন্নয়নমূলক কাজেই ব্যয় হবে। আরও উদ্বেগজনক বিষয় হল—সাংবাদিক নিজে যখন “Swachh Bharat” বা “Beti Bachao” নামে দান করেন, তখন যে রসিদ পাওয়া যায়, তাতে স্পষ্ট লেখা থাকে—“BJP Party Fund”। কোথাও কোনও সরকারি প্রকল্পের উল্লেখ নেই। অর্থাৎ প্রকল্পের নাম শুধুমাত্র মুখোশ হিসেবে ব্যবহার করা হলেও বাস্তবে টাকা সরাসরি বিজেপির তহবিলেই পৌঁছেছে।
আইন বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, এটি সরাসরি misrepresentation বা বিভ্রান্তিকর উপস্থাপনার শামিল। কারণ সরকারি প্রকল্পের নাম ব্যবহার করলে নাগরিকদের মধ্যে স্বাভাবিকভাবেই একটি প্রত্যাশা তৈরি হয়—তাঁদের দেওয়া অর্থ জনগণের কল্যাণেই খরচ হবে। কিন্তু এখানে সেই প্রত্যাশা ভেঙে দেওয়া হয়েছে।
ভারতে রাজনৈতিক অর্থায়নের স্বচ্ছতা দীর্ঘদিন ধরেই প্রশ্নের মুখে। নির্বাচনী বন্ড বিতর্ক এখনও চলছে। অন্যদিকে, PM CARES ফান্ডের অর্থব্যয়ের কোনও পূর্ণাঙ্গ হিসাবও কেন্দ্রীয় সরকার প্রকাশ করেনি। এমনকি একে বেসরকারি সংস্থা বলে দায় এড়ানোর চেষ্টা করা হয়েছে, যদিও প্রধানমন্ত্রী নিজে এই তহবিল প্রচার করেছিলেন। ফলে দায় এড়ালেও প্রশ্নের আঙুল তাঁর দিকেই উঠছে।
এই নতুন তথ্য আরও একবার দেখিয়ে দিল, রাজনৈতিক তহবিল সংগ্রহ এবং সরকারি প্রকল্প—এই দুইয়ের মধ্যকার সীমারেখা ক্রমশ ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে। অথচ একটি দেশের সরকারি প্রকল্প ও একটি রাজনৈতিক দলের তহবিল সম্পূর্ণ আলাদা বিষয়—এই মৌলিক গণতান্ত্রিক নীতি ভেঙে পড়লে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় জনগণের আস্থা।
এই প্রসঙ্গে সিপিআইএম পশ্চিম মেদিনীপুর জেলা সম্পাদক বিজয় পাল বলেন, “ইলেক্টোরাল বন্ড ছিল বিজেপির তোলাবাজির একটি হাতিয়ার। তাই আমরা একটি নয়া পয়সাও নির্বাচনী বন্ডের নামে নিইনি। আমরা মানুষের সামনে ভিক্ষা করেই পার্টি চালিয়েছি এবং ভবিষ্যতেও চালাব। সুপ্রিম কোর্টে আইনি লড়াই লড়ে আমরা প্রমাণ করেছি, নির্বাচনী বন্ড বিজেপির দুর্নীতির হাতিয়ার। সাম্প্রদায়িক বিষ ছড়ানোর মতো দুর্নীতি ইস্যুতেও তৃণমূল ও বিজেপি একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ। সাধারণ মানুষের জীবনকে দুর্বিসহ করে তোলা এই দুই বিষফুল উপড়ে না ফেলা পর্যন্ত আমাদের লড়াই চলবে। এবং তাই মানুষ নিজের অভিজ্ঞতা দিয়ে বুঝছেন বলেই সিপিআইএমের বাংলা বাঁচাও যাত্রায় এমন অপ্রত্যাশিত সাড়া মিলছে, হাজার হাজার মানুষ নিজের থেকেই পা মেলাচ্ছেন শ্রমিক কৃষক সাধারণ মানুষের কথা বলা লাল ঝান্ডার মিছিলে। ”