‘নিষিদ্ধ গান’-কেই অস্ত্র করে এবার পথে নামছেন বাঙালী বিদ্বজনেরা, পাহাড় থেকে সমুদ্র ধ্বনিত হবে ‘আমার সোনার বাংলা’

রবি ঠাকুরের ‘আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি’ নিয়ে বিতর্ক তৈরি করা বিজেপিকে এবার কড়া ভাষায় আক্রমণ করে পথে নামছেন বাংলার অগণিত বিদ্বজনেরা। মঙ্গলবার সকাল ও সন্ধ্যায় বাংলার পাহাড় থেকে সমুদ্র পর্যন্ত গানটি গাওয়ার ডাক দিয়েছেন তাঁরা। ইতিমধ্যেই সেই ডাকে বাংলার আপামর জনগণ থেকে শুরু করে বিভিন্ন বাম গণসংগঠন নিজেদের মতো করে প্রস্তুতি নিয়েছে। যেমন মেদিনীপুরে পঞ্চুর চকে সন্ধ্যা ৭টায় বামপন্থী গণসংগঠনগুলির পক্ষ থেকে সমবেত কণ্ঠে ‘নিষিদ্ধ গান’-কেই অস্ত্র করা হবে।

বিদ্বজনদের প্রচারিত এক বক্তব্যে বলা হয়েছে— “আমরা গভীর উদ্বেগের সঙ্গে লক্ষ করছি, বাংলা ভাষা এবং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর-সহ বহু প্রথিতযশা বাঙালি মনীষীকে ধারাবাহিকভাবে অবমাননা করে চলেছেন বিজেপি নেতৃত্ব, এমনকি কেন্দ্রীয় মন্ত্রী-সহ কয়েকটি বিজেপি শাসিত রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীরাও।

বঙ্গভঙ্গের প্রতিবাদে ১৯০৫ সালের ৭ আগস্ট কলকাতার টাউন হলে যে সভা হয়, সেই উপলক্ষে রবীন্দ্রনাথ রচনা করেন গান ‘আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি’। এই গান পরিবেশন করাকে সম্প্রতি রাষ্ট্রদ্রোহী কাজ রূপে চিহ্নিত করেছেন অসমের মুখ্যমন্ত্রী। লজ্জার বিষয় যে, পশ্চিমবঙ্গের কয়েকজন বিজেপি নেতা বলেছেন, এই রাজ্যেও তাঁরা ক্ষমতায় এলে এই গানটিকে নিষিদ্ধ করে দেবেন। আমরা দেখেছি, বাংলা ভাষায় কথা বলার ‘অপরাধে’ বেশ কয়েকটি বিজেপি শাসিত রাজ্যে অনেক বাঙালিকে হেনস্থা করা হয়েছে, এমনকি বলপূর্বক বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে।

আমরা এই ধরনের উক্তি ও ঘটনার তীব্র প্রতিবাদ জানাই এবং শুধু পশ্চিমবঙ্গ নয়, আমাদের দেশ ও পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে বসবাসকারী সকল বাংলাভাষী ও বাংলাপ্রেমী মানুষের প্রতি আহ্বান জানাই— এর প্রতিবাদে আপনারাও এগিয়ে আসুন, উচ্চকণ্ঠ হোন। এই বাংলায় স্বাধীনতা আন্দোলনের ঐতিহ্য বহন করছে যে গান, আসুন আমরা শপথ নিই তার অমর্যাদা হতে দেব না। আগামী ৪ নভেম্বর, ২০২৫, মঙ্গলবার সকাল ও সন্ধ্যায় পাহাড় থেকে সাগর— ধ্বনিত হোক এই গান।”

এই আবেদন জানিয়েছেন— শমীক বন্দ্যোপাধ্যায়, পবিত্র সরকার, অনিতা অগ্নিহোত্রী, স্বপ্নময় চক্রবর্তী, ভগীরথ মিশ্র, রুদ্রপ্রসাদ সেনগুপ্ত, অশোক মুখোপাধ্যায়, মেঘনাদ ভট্টাচার্য, চন্দন সেন (বড়), অরুণ মুখোপাধ্যায়, বিভাস চক্রবর্তী, অসিত বসু, ভদ্রা বসু, রাজা সেন, ঊর্মিমালা বসু, সব্যসাচী চক্রবর্তী, প্রমিতা মল্লিক, শ্রীকান্ত আচার্য, পূরবী মুখোপাধ্যায়, পূবালী দেবনাথ, রাজশ্রী ভট্টাচার্য, অগ্নিভ বন্দ্যোপাধ্যায়, সুব্রত সেনগুপ্ত, শুভেন্দু মাইতি, অলক রায়চৌধুরী, দেবজ্যোতি মিশ্র, কল্যাণ সেন বরাট, মালিনী ভট্টাচার্য, দেবশঙ্কর হালদার, পল্লব সেনগুপ্ত, কিন্নর রায়, কমলেশ্বর মুখোপাধ্যায়, মানসী সিনহা, দীপালী ভট্টাচার্য, অর্ক মুখার্জী, জয়রাজ ভট্টাচার্য, তূর্ণা দাস, সৌরভ পালোধি, নিরঞ্জন গোস্বামী, দেবপ্রতিম দাশগুপ্ত, বাদশা মৈত্র, দেবদূত ঘোষ, সীমা মুখোপাধ্যায়, প্রিয়নাথ মুখার্জী, শংকর মিত্র, মৈনাক সেনগুপ্ত, মনীষা আদক, গৌতম চক্রবর্তী, সুস্মিতা পান, জগন্নাথ চক্রবর্তী, তমোজিত রায়, আভাষ ভট্টাচার্য, মৃণালকান্তি দাস, বিমল চক্রবর্তী, প্রদীপ দত্ত, দীপাঞ্জন ভট্টাচার্য, অনিন্দিতা সর্বাধিকারী, ডাঃ অর্জুন দাশগুপ্ত, ডাঃ তপনজ্যোতি দাস, ডাঃ তমোনাশ ঘোষ, ডাঃ উৎপল বন্দ্যোপাধ্যায়, ডাঃ সুবর্ণ গোস্বামী, অরূপ রায়, চন্দন সেন, কাজি কামাল নাসের, ময়ূখ-মৈনাক, সুপ্রিয় দত্ত, সঞ্চিতা সান্যাল, সত্যজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়, শ্যামল চক্রবর্তী, অরিন্দম চট্টোপাধ্যায়, শ্যামল সেনগুপ্ত, শুভংকর চক্রবর্তী, অশোকনাথ বসু, বিজয়লক্ষ্মী বর্মন, রজত বন্দ্যোপাধ্যায়, মন্দাক্রান্তা সেন, পার্থপ্রতিম বিশ্বাস, সুকুমার ঘোষ, রত্না মিত্র, সুমন্ত্র সেনগুপ্ত, বাসব দাশগুপ্ত, পারমিতা দাশগুপ্ত, স্বপন পাণ্ডা, সুকান্তি দত্ত, শ্রাবন্তী ভট্টাচার্য, কৌস্তভ দে, সজীব সরকার, রোমিত গাঙ্গুলি, অনিরুদ্ধ দাশগুপ্ত, শঙ্কর দেবনাথ, ঋদ্ধিবেশ, অনমিত্র খাঁ, আব্দুল কাফি, শুভময়, জাদ মামুদ, অনির্বাণ বসু, শাক্যজিৎ ভট্টাচার্য, সিজি, সোমদেব, বুলবুল ইসলাম-সহ অনেক বিশিষ্ট নাগরিক।

বিতর্কের শুরু হয় অসম থেকে। গত মাসের শেষ সপ্তাহে সেখানে বরাক উপত্যকার বাংলাদেশ-সংলগ্ন জেলা শ্রীভূমিতে (সাবেক করিমগঞ্জ জেলা) কংগ্রেসের একটি সভা ছিল। সেখানে গাওয়া হয় রবি ঠাকুরের গানটি। সেই ভিডিও ছড়িয়ে পড়তেই রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগ তুলে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয় অসমের বিজেপি সরকারের তরফে। তাদের অভিযোগ, এটি বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত, তাই সেই গান গাওয়া রাষ্ট্রদ্রোহিতা।

তার পরই বাংলা তথা বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা বাঙালি, এমনকি শুভবুদ্ধিসম্পন্ন ভারতীয়রাও অসম সরকারের এই ভূমিকার তীব্র নিন্দা করেন। এবার ‘নিষিদ্ধ গান’-কেই অস্ত্র করছেন বাংলার বিদ্বজনেরা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *