নিজস্ব সংবাদদাতা, মেদিনীপুর, ২ নভেম্বর: ব্যাভিচার ও দুর্নীতি ইস্যুতে রাষ্ট্রশক্তি নীরব থেকে তাকে আড়াল করার চেষ্টা করছে। এই অভিযোগ তুলে শিক্ষাকে বাঁচাতে আরও বড় আকারে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলার আহ্বান জানাল নিখিল বঙ্গ শিক্ষক সমিতি (ABTA)।
রবিবার মেদিনীপুরের বিদ্যাসাগর হলে সংগঠনের পশ্চিম মেদিনীপুর জেলা কমিটির ১১তম ত্রিবার্ষিক সম্মেলনের মঞ্চ থেকে আহ্বান জানানো হয় — প্রতিটি স্কুলে শিক্ষকদের পাশাপাশি ছাত্রছাত্রী ও অভিভাবকদেরও এই আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার।
বিদ্যাসাগর হল-সংলগ্ন ময়দানে রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, সুকান্ত ও সলিল চৌধুরীর গান ও কবিতা সাজিয়ে এক সাংস্কৃতিক গীতি-আলেখ্যের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠানের সূচনা হয়। বিদ্যাসাগর ও রাজা রামমোহনের সমাজ সচেতনতার বার্তাও তুলে ধরা হয় অনুষ্ঠানে। এই সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে অংশ নেন একাধিক স্কুলের ছাত্রছাত্রী ও শিক্ষক-শিক্ষিকা।
সম্মেলনের শুরুতে সংগঠনের পতাকা উত্তোলন ও শহীদ বেদিতে মাল্যদান কর্মসূচি পালিত হয়। পতাকা উত্তোলন ও শোকপ্রস্তাব উত্থাপন করেন জেলা শাখার সভাপতি মৃণালকান্তি নন্দ। সম্মেলনের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন সংগঠনের রাজ্য সভাপতি সুদীপ্ত গুপ্ত।

উদ্বোধনী বক্তব্যে তিনি বলেন, বর্তমানে দেশ ও রাজ্য — দুই সরকারই নতুন শিক্ষা নীতির মাধ্যমে শিক্ষাকে গরিব ও মধ্যবিত্তের নাগালের বাইরে নিয়ে যেতে চাইছে। এতগুলি পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার পরও “সবার জন্য শিক্ষা ও কাজ” আজও অবহেলিত। সরকার এখন বেসরকারি শিক্ষা ও স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে আরও পুষ্ট করার নীতি নিচ্ছে।
এই পরিস্থিতির বিরুদ্ধে আন্দোলন জোরদার করতে এবিটিএ-কে আরও গুরুত্বের সঙ্গে নিজেদের দায়িত্ব পালনের আহ্বান জানান তিনি।
এরপর সম্পাদকীয় প্রতিবেদন পেশ করেন জেলা শাখার সম্পাদক জগন্নাথ খান। আয়-ব্যয়ের হিসাব উপস্থাপন করেন জেলা কোষাধ্যক্ষ প্রভাসচন্দ্র ভট্টাচার্য। সম্পাদকীয় প্রতিবেদনের ওপর আলোচনায় অংশ নেন তিনটি মহকুমা শাখার ১৫ জন প্রতিনিধি। এছাড়া বিভিন্ন বিভাগীয় আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন আরও ৫ জন প্রতিনিধি।
সম্মেলনের সাফল্য কামনা করে এবং ভবিষ্যতের অভিমুখ নির্ধারণ করে বক্তব্য রাখেন সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক সুকুমার পাইন। তিনি বলেন, রাজ্যে সরকারি শিক্ষার পরিকাঠামো ধ্বংসের যে পরিকল্পিত পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, তার বিরুদ্ধে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলার লড়াইয়ে এবিটিএ-র প্রতিটি সদস্যকে দায়িত্ববান হতে হবে।
তিনি উল্লেখ করেন, বর্তমানে রাজ্যের শিক্ষা ক্ষেত্রে নৈরাজ্য ও দুর্নীতি ১৯৭২ থেকে ১৯৭৭ সালের সেই অন্ধকার দিনগুলোকেও হার মানিয়েছে। তৃণমূল কংগ্রেস আমলে একের পর এক সরকারি স্কুল বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।
অন্যদিকে, রাজ্যে আরএসএস পরিচালিত স্কুল ও বেসরকারি স্কুল-কলেজের সংখ্যা সমান হারে বাড়ছে।
তিনি অভিযোগ করেন, কেন্দ্রের বিজেপি সরকার শিক্ষা ও স্বাস্থ্যকে বেসরকারিকরণের পথে নিয়ে যেতে চাইছে।
আর সেই নীতিকেই রাজ্যে কার্যকর করছে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে তৃণমূল কংগ্রেস সরকার।
তিনি বলেন, এবিটিএ ও শিক্ষক সমাজ জন্মলগ্ন থেকেই সমাজ গড়ার কারিগর হিসেবে কাজ করে চলেছে।
নিজেদের দাবি আদায়ের পাশাপাশি সামাজিক সংকট মোকাবিলার দায়িত্বও পালন করেছে। স্বাধীনতা আন্দোলনে এবিটিএ-র ভূমিকার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, আজও সংগঠনকে শিক্ষাঙ্গনে গণতন্ত্র, মুক্ত চিন্তা ও বাকস্বাধীনতার পরিবেশ পুনরুদ্ধারের লড়াইয়ে অঙ্গীকারবদ্ধ থাকতে হবে।
সম্মেলনে অভিনন্দন জানিয়ে বক্তব্য রাখেন ছাত্রনেতা রণিত বেরা, ১২ই জুলাই কমিটির নেতা গঙ্গাধর বর্মন প্রমুখ।
উপস্থিত ছিলেন বিভিন্ন ভ্রাতৃপ্রতিম গণসংগঠনের জেলা নেতৃত্ব। বক্তব্য রাখেন অভ্যর্থনা সমিতির সভাপতি অধ্যাপক বিমলকৃষ্ণ দাস। সম্মেলন পরিচালনা করেন মৃণালকান্তি নন্দ-সহ পাঁচজনের সভাপতি মণ্ডলী।