নিজস্ব সংবাদদাতা, সিউড়ি: স্বচ্ছ ভোটার তালিকা তৈরির নামে ‘SIR আতঙ্কে’ ফের আত্মহত্যা এক প্রবীণের। আশঙ্কা— ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ পড়লে বাংলাদেশে ফেরত যেতে হবে! এই আতঙ্কেই বীরভূমের ইলামবাজারে আত্মঘাতী হলেন ৯৫ বছরের ক্ষিতীশ মজুমদার। ঘটনায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে পরিবারে, আর চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে গোটা রাজ্য জুড়ে।
মৃত প্রবীণ পশ্চিম মেদিনীপুরের বাসিন্দা। কয়েক মাস ধরে মেয়ের বাড়িতে, ইলামবাজার ব্লকের স্কুলবাগান সুভাষপল্লি গ্রামে ছিলেন। বুধবার রাতে নিজের ঘরেই গলায় দড়ি দিয়ে আত্মহত্যা করেন ক্ষিতীশবাবু। বৃহস্পতিবার সকালে তাঁর ঝুলন্ত দেহ দেখতে পান পরিবারের সদস্যরা। পুলিশ দেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তে পাঠিয়েছে।
পরিবারের অভিযোগ— “গত কয়েকদিন ধরে বাবা খুব চিন্তিত ছিলেন। সবাই বলছিল, SIR যাচাইয়ে নাম না থাকলে বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেওয়া হবে। তিনি বলতেন, ‘আমার নাম যদি না থাকে? আমাকে যদি ফেরত পাঠায়?’”— জানালেন মৃতের নাতনি নির্মলা মজুমদার।
তদন্তে জানা গিয়েছে, তিন দশক আগে ক্ষিতীশ মজুমদার তাঁর পরিবার-সহ বাংলাদেশ থেকে পশ্চিমবঙ্গে চলে আসেন। পশ্চিম মেদিনীপুরে বসবাস শুরু করেন এবং বহুবার ভোটও দেন। কিন্তু সম্প্রতি আশপাশের মানুষের মুখে শোনা গুজব— “২০০২ সালের ভোটার তালিকায় নাম না থাকলে নাগরিকত্ব যাচাইয়ে বাদ পড়বেন।”
এই ভয়ই প্রবীণকে মানসিকভাবে দুর্বল করে তোলে, এমনটাই দাবি পরিবারের।
পানিহাটিতেও আত্মহত্যা ‘SIR আতঙ্কে’
এর আগেও একই আশঙ্কায় প্রাণ হারিয়েছিলেন উত্তর ২৪ পরগনার পানিহাটির প্রদীপ কর। এনআরসি–SIR নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়ে তিনি আত্মহত্যা করেন বলে অভিযোগ। তাঁর মৃতদেহের কাছ থেকে উদ্ধার হয় একটি চিঠি। সেখানে লেখা ছিল— “আমাকে যদি বাংলাদেশে পাঠায়, আমি বাঁচব না।” যদিও বিষয়টি আত্মহত্যা বলে মানতে চাননি বিরোধী দলের অনেক নেতাই। অন্য দিকে জাস্টিস ফর প্রদীপ কর স্লোগান তুলে মিছিল করেছে তৃণমূল। যাকে আবার কটাক্ষ করে স্লোগান চুরি বলে কটাক্ষ করেছেন সিপিআইএম নেতা শতরূপ ঘোষ।
ইলামবাজারের ক্ষিতীশ মজুমদারের মৃত্যুর পর ফের সামনে এল সেই ভয়। স্থানীয় তৃণমূল নেতৃত্বের বক্তব্য—
“যেদিন থেকে এনআরসি–SIR কথাটা মানুষের কানে গিয়েছে, সেইদিন থেকেই আতঙ্ক ছড়িয়েছে। এই মৃত্যুগুলির দায় বিজেপি সরকারের।” বিজেপির পক্ষ থেকে অবশ্য দাবি করা হয়েছে— “SIR (Special Intensive Revision) শুধুই ভোটার তালিকা ঝাড়াই বাঝাই করার নিয়মিত প্রশাসনিক প্রক্রিয়া। গুজব ছড়াচ্ছে রাজনৈতিক স্বার্থে।”
বীরভূম জেলা প্রশাসনের এক আধিকারিক বলেন, “ভোটার তালিকা পর্যালোচনা একটি নিয়মিত প্রক্রিয়া। কারও নাগরিকত্ব বা দেশের থাকার অধিকার নিয়ে আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। কোথাও নাম না থাকলে তার সংশোধনের সুযোগও থাকে।”
তবুও, প্রবীণের আত্মহত্যা ঘিরে মানবাধিকার সংগঠনগুলির মধ্যে ক্ষোভ ছড়িয়েছে। তারা ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্তের দাবি জানিয়েছে।
রাজ্যজুড়ে ‘SIR’ আতঙ্ক এখন এক সামাজিক মানসিক বিপর্যয়ের রূপ নিচ্ছে— এমনটাই মনে করছেন মনোবিজ্ঞানীরা। তাঁদের মতে, “যখন রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার সঙ্গে নাগরিক নিরাপত্তার প্রশ্ন মিশে যায়, তখন প্রবীণদের মতো দুর্বল শ্রেণি সবচেয়ে বেশি মানসিক আঘাত পায়।” এখন প্রশ্ন, ‘স্বচ্ছ ভোটার তালিকা’ তৈরির প্রশাসনিক উদ্যোগ কতটা মানবিক রূপ নিচ্ছে? আর কত প্রাণ যাবে আতঙ্কের ছায়ায়?