কার্বাইড গান: সোশ্যাল মিডিয়ার ট্রেন্ডে নতুন আতঙ্ক — শতাধিক শিশু আহত, দৃষ্টিশক্তি হারাল অনেকে

নিজস্ব সংবাদদাতা, ভোপাল, ২০ অক্টোবর: দীপাবলির আলো, আতশবাজি আর উৎসবের উচ্ছ্বাসের মাঝেই ভারতে ছড়িয়ে পড়েছে এক প্রাণঘাতী নতুন “খেলনা”— কার্বাইড গান বা দেশি ফায়ারক্র্যাকার গান। দেখতে সাধারণ পাইপে বানানো যন্ত্র, কিন্তু বাস্তবে এটি এক বিপজ্জনক বিস্ফোরক, যা ইতিমধ্যেই বহু শিশুর জীবন অন্ধকারে ঢেকে দিয়েছে।

রাসায়নিক প্রতিক্রিয়া থেকেই শুরু বিপদ

‘কার্বাইড গান’-এর মূল উপাদান ক্যালসিয়াম কার্বাইড (CaC₂)। জল মেশালে এটি তাপ উৎপাদক বিক্রিয়ার মাধ্যমে অ্যাসিটিলিন গ্যাস তৈরি করে, যা অত্যন্ত দাহ্য। পাইপের মধ্যে এই গ্যাস জমে গেলে অল্প আগুনেই তীব্র বিস্ফোরণ ঘটে। অনেক সময় পাইপ ফেটে বোমার মতো ছিটকে যায়, ফলে চোখে মুখে ভয়াবহ আঘাত লাগে।

হামিদিয়া মেডিক্যাল কলেজের চক্ষু বিভাগের প্রধান ডাক্তার আর কে গুপ্ত জানান, “গত তিন দিনে আমরা ২৬ জন নতুন রোগী পেয়েছি— বেশির ভাগই ১০ থেকে ১৭ বছর বয়সি কিশোর। অন্তত ১৪ জন স্থায়ীভাবে দৃষ্টিশক্তি হারিয়েছে।”

ভয়াবহ অভিজ্ঞতা: এক রিলের দাম এক জীবন

ভোপালের নেহা (১৭) ইউটিউব দেখে বন্ধুদের সঙ্গে এই গান বানিয়েছিল। লাইটার ধরাতেই পাইপে বিস্ফোরণ হয়, আগুনের ফুলকি চোখে লাগে। এখন তার এক চোখ ঝলসে গেছে।

জবলপুরের রাজ বিশ্বকর্মার ক্ষেত্রেও একই কাহিনি— “সোশ্যাল মিডিয়ায় বাচ্চারা হাসছিল, তাই আমিও বানালাম। এখন কিছুই দেখতে পাচ্ছি না,” হাসপাতালে বেডে শুয়ে শুয়ে একথা বলছে সে।

সরকারি নিষেধাজ্ঞা ও পুলিশের অভিযান

১৮ অক্টোবর ২০২৫ থেকে মধ্যপ্রদেশ সরকার কার্বাইড গান বিক্রি, তৈরি ও ব্যবহার নিষিদ্ধ করেছে। কিন্তু নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে বাজারে এমনকি অনলাইনেও এই পণ্য বিক্রি চলছে। বিদিশা জেলায় পুলিশের অভিযানে ইতিমধ্যেই ৬ জন বিক্রেতাকে বিস্ফোরক আইনে গ্রেফতার করা হয়েছে।

‘রিল কালচার’-এর বিপদ: ভাইরাল হওয়ার নেশায় বিপর্যয়

সোশ্যাল মিডিয়ায় “#CarbideGunChallenge” বা “#MiniCannon” হ্যাশট্যাগে হাজার হাজার ভিডিও ভাইরাল। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যত বেশি বিপজ্জনক এবং চমকপ্রদ, তত দ্রুত জনপ্রিয় হয়। একজন মিডিয়া বিশ্লেষকের ভাষায়, “এই ট্রেন্ড মূলত peer pressure ভিত্তিক ভাইরাল আচরণ। কিশোররা ভাবছে— যত জোরে ফাটবে, তত বেশি লাইক মিলবে।”

কী করণীয়

চিকিৎসক, প্রশাসন ও অভিভাবকদের সমন্বিত উদ্যোগই এখন জরুরি—

শিশুদের নাগালের বাইরে রাখতে হবে কার্বাইড ও পাইপজাত বস্তু।

অনলাইন বা দোকানে বিক্রি দেখলে সঙ্গে সঙ্গে পুলিশকে জানাতে হবে।

স্কুলে রাসায়নিক নিরাপত্তা ও সোশ্যাল মিডিয়া সচেতনতা বিষয়ক শিক্ষা চালু করা দরকার।

সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মগুলোকেও দ্রুত এই ভিডিও সরাতে হবে।

দীপাবলি আনন্দের প্রতীক, আলো ও জীবনের উৎসব। কিন্তু কার্বাইড গান সেই আলোকেই অন্ধকারে রূপান্তর করছে। বিজ্ঞানকে উপেক্ষা করে অন্ধ অনুকরণে মেতে ওঠার ফল কত ভয়াবহ হতে পারে, সেই শিক্ষা এখন দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়ছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *