বিপন্ন গ্রাম, প্রতিকারে কৃষক শ্রমজীবী মৈত্রীর লড়াই

রাস্তাঘাট সহ শিক্ষা স্বাস্থ্যর পরিকাঠামো বিপন্ন, সংকোট রুটি রুজির, বুথের সংকোট বুথের সমস্যা প্রতিকারে কৃষক শ্রমজীবী মৈত্রীর লড়াই জোরদার করার পদক্ষেপ হিসাবে সারা ভারত কৃষক সভা পশ্চিম মেদিনীপুর জেলা ৩৯তম সম্মেলন মঞ্চে সংগঠিত হলো শ্রমিক ক্ষেতমজুর সংগঠনের স্পেশাল সেশান। স্থানীয় ইস্যু, উচ্ছেদ হওয়া বর্গাদার পাট্টাদের জমি উদ্ধার থেকে বুথে বুথে আবাস বঞ্চিত থেকে পঞ্চায়েতে দূর্ণীতির প্রতিকারে, একশ দিনের কাজ চালুর দাবীতে বুথের পঞ্চায়েত সদস্যর বাড়ীতে ডেপুটেশনে গ্রামের মানুষকে সামিল করে আন্দোলন শুরুর কর্মসূচি রূপায়ন নভেম্বর মাস থেকে শুরু করার সিদ্ধান্ত ঘোষনা হয় এই মৈত্রী বন্ধনের সভা থেকে।

এই সভায় কৃষক সভার বিদায়ী জেলা সম্পাদক মেঘনাদ ভূঁইয়া বলেন, কৃষক সভা একটি সমাজের অন্তর্ভুক্ত রাজনৈতিক সংগঠন।মিশ্র বৈশিষ্ট্য নিয়ে অবস্থান করে। কৃষির সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। কৃষকের মুক্তির সংগ্রামে কৃষির আমূল পরিবর্তন না হলে কৃষক সমাজের শোষণ মুক্তি হওয়া সম্ভব নয়। সে কারণেই সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী, একচেটিয়া পুঁজি বিরোধী ও আধা সামন্ততান্ত্রিক শোষণের বিরুদ্ধে লড়াই এবং শ্রেণি লড়াই-এর এক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এই দ্রুত আমূল পরিবর্তনের প্রশ্নে শ্রেণি হিসাবে শ্রমিক শ্রেণিই শ্রেণি বিপ্লবের প্রধান নেতৃত্ব দিবেন।
এমতাবস্থায় আমাদের ইতিহাস নির্দিষ্ট দায়িত্ব পালনের উদ্যোগী হতে হলে শ্রমিক শ্রেণির নেতৃত্বে পরিচালিত হয়ে শ্রমিক কৃষক মৈত্রী গড়ে তুলতেই হবে। একটি গণতান্ত্রিক বিপ্লবী কৃষক সংগঠনের ক্ষেত্রে এই কর্তব্য পালন করতেই হবে। এরূপ কর্তব্য পালন আলোচ্য সময়কালে ভিন্ন রূপে প্রতিপালন করেছে আমাদের জেলা কৃষক সভা। গ্রামাঞ্চলে বহুসংখ্যক যুবক আজ অকৃষি কাজের সংগে যুক্ত হয়ে আছে। তৃণমূলের রাজত্বে কৃষির সংকোট বেড়েছে, শিল্পে খরা, রুটি রুজির সংকোট মোকাবিলার পরিযায়ী শ্রমিকের গ্রাম নতুন চেহেরায়। এরূপ অসংগঠিত শ্রমজীবী মানুষদের সাথে যৌথ আন্দোলন সংগ্রাম সময়ের দাবী। তিনি বলেন ইতিহাস শিক্ষা দেয়, সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী, সামন্ততন্ত্র বিরোধী একচেটিয়া লগ্নি পুঁজির বিরোধী যুক্ত আন্দোলন গড়ে তোলে কৃষক সভার যৌথ দায়িত্ব পালনের মধ্য দিয়েই তা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

আলোচনা সভায় শ্রমিক নেতা বিজয় পাল বলেন, বর্তমান সময়ে আমাদের জেলায় “জব কার্ড রক্ষা করো, কাজের অধিকার আদায় করো”-আন্দোলন এই অভিজ্ঞতা দেয় নতুন নতুন পরিসর সহ বহু মানুষ আবারোও লাল ঝান্ডার আন্দোলনে সামিল হয়েছেন। হাইকোর্টের নির্দেশ মতো আগষ্ট মাসে কাজ চালুর কথা থাকলেও শুরু করেনি তৃণমূল কংগ্রেস সরকার। আমাদের জবকার্ড হোল্ডারদের কাছে বার্তা নিয়ে যেতে হবে, এই কাজের দাবীর ৪ ক ফর্ম জমা করানোর মধ্য দিয়ে আপনার জবকার্ড বাতিল হওয়ার থেকে রক্ষা পেলো। এবার কাজের দাবীতে বুথের পঞ্চায়েত কে লিখিত ডেপুটেশন দিয়ে তাকেই বলতো হবে পঞ্চায়েত ঘেরাও করার কর্মসূচি আমরা করবো আপনাকে থাকতে হবে। এমন আরো বহু ইস্যু রয়েছে বেহাল রাস্তাঘাট, বেহাল আই সি ডি এস কেন্দ্র সহ অঞ্চলের বেহাল স্বাস্থ্য কেন্দ্র সহ উচ্ছেদ হওয়া পাট্টাদার বর্গাদার দের জমি পুনরুদ্ধার লড়াই। এক জন কৃষকের বা ক্ষেতমজুর সহ জবকার্ড হোল্ডার পরিবারে রয়েছে পরিযায়ী, ঠিকাশ্রমিক, মুটিয়া সহ নির্মাণ কর্মী এমন বহু অসংগঠিত ক্ষেত্রের শ্রমিক সহ প্রকল্প কর্মী। আশা, মিড ডে মিল, শিক্ষাবন্ধু, প্যারা টিচার এদের প্রতি যে বঞ্চনা, সামাজিক সুরক্ষার ন্যূনতম কোনো পদক্ষেপ না থাকা তাদের সবাইকে একত্রিত করার কাজ বুথে বুথে সংগঠিত করার সিদ্ধান্ত শুধু নয়, নভেম্বর বিপ্লব বার্ষিকীর এই কর্মসূচী সংগঠিত করার ঘোষিত হয় এমন সভা থেকে। সভায় মতামত ব্যাক্ত করেন সিআইটিইউ জেলা সম্পাদক গোপাল প্রামানিক, ক্ষেতমজুর সংগঠনের জেলা সম্পাদক চিত্ত পাল।

শনিবার শুরু হওয়া এই সম্মেলন অংশ গ্রহন করেন ৪৩৮ জন প্রতিনিধি। ২১ টি ব্লক কমিটি থেকে ৩১ জন আলোচনা করেন। উঠে আসে জেলা জুড়ে বর্গাদার পাট্টাদার উচ্ছেদ সহ সরকারী আম কাজু বাদাম সহ নানান বাগান কর্পোরেটের হাতে তুলে দিয়ে রুটি রুজির সংকোটকে আরো তীব্র করার প্রতিকারের আন্দোলন গড়ে তোলার প্রস্তাব। তাই নয় জেলায় গোয়ালতোড়, আনন্দপুর, নাড়াজোল সহ একাধিক স্থানে সরকারী বীজ খামার, আলু বীজ খামার নষ্টন করে গড়ে উঠেছে কোটী কোটী টাকার বেনিয়ম খরচের কিষান মান্ডির হল। সেই কিষান মান্ডি এখন ভূতুড়ে খানা হয়ে জুয়া, মদের ঠেক হয়েছে। আর সবুজ সাথী সাইকেল সরবরাহ কোম্পানীর গোাডাউন ঘর। কৃষি কৃষক এর সর্বনাশ সহ ক্ষেতমজুর মানুষের কাজ নষ্ট করা হয়েছে। বহু জলাশয় কে পতিত করে রেখে মৎস্য জীবীদেরও রুটি রুজির সংকোট তৈরী করা হয়েছে। এমন নির্দিষ্ট বিষয় গুলি নিয়ে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলার প্রস্তাব গৃহিত হয়। আলোচনা করেন মাছ, পান, দুগ্ধ চাষী সংগঠন সহ সমবায় বাঁচাও মঞ্চের পক্ষ থেকে।

সম্মেলন মঞ্চে প্রতিনিধিদের সামনে অভিনন্দন জানিয়ে এবং সংগঠনের আগামী দিনের কাজ এবং দেশ ও রাজ্য জুড়ে কৃষি কৃষকের সমস্যা সংকোট গুলি তুলে ধরে এবং তার প্রতিকারের আন্দোলনের অভিমুখ তুলে বক্তব্য রাখেন সংগঠনের রাজ্য সম্পাদক অমল হালদার। তিনি বলেন দেশ ও রাজ্যে বহু মুখী আক্রমণ ও সংকোটের মুখেও বর্তমান সম্ভাবনা কে কাজে লাগানোর উপযোগী হতে হবে আমাদের সবাই কে। তিনি বলেন, দেশ থেকে বিজেপি কে কোনঠাসা করতে পারলে এরাজ্যেও তৃণমূল কংগ্রেস রাতারাতি উধাও হয়ে যাবে। এই মহুর্তে দেশ জুড়ে বিজেপি কোনঠাসার দিকে আর তৃণমূলও সেই আগের মতো অবস্থায় নেই। পায়ের তলায় মাঠি হারাচ্ছে। তবে আর এস এস বিজেপি হাতিয়ার সাম্প্রদায়িক ক্রিয়াকলাপের সাথে হিন্দুত্ব কর্পোরেট আঁতাত। তাসত্বে গত লোকসভা নির্বাচনে বিজেপি একক সংখ্যা গরিষ্ঠ পায়নি। সেই রাম মন্দির এলাকায় সাতটা বিধানসভায় হেরেছে। হরিয়ানা পাঞ্জাবে হেরেছে। তার কারণ এদেশের কৃষক আন্দোলন। সংযুক্ত মোর্চার নেতৃত্বে আন্দোলনে মোদীর বিজেপি সরকার বাধ্য হয়েছে কালা কৃষি আইন প্রত্যাহার করতে। কিন্তু তাবলে কৃষক কৃষির উপর বিজেপি সরকারের মনোভাব একই রয়েছে, কর্পোরেট ও বেনিয়াদের স্বার্থ রক্ষার দালালির পদক্ষেপ নিতে মরিয়া।

আমাদের রাজ্যে ফড়েদের পৃষ্ঠপোষক সরকার চলছে। সার বীজ সহ কৃষককের ফসলের দাম নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে এদের হাতে। আর সারা রাজ্য জুড়ে লুম্পেন রাজ, গুন্ডারাজ কায়েক করেছে চলছে দূর্ণীতি সহ লুঠের রাজত্ব। রাজ্যে মমতার হাত ধরে বহু থানা ও ফাঁড়ি বেড়েছে। এগুলো জনগণের স্বার্থে নয়। উদাহরন দিয়ে বলেন তাহলে এত লুঠ ডাকাতি, বালি গাছ কয়লা মোরাম বোল্ডার গরু পাচার সহ নারী নির্যাতন বাড়ে কি করে। আসলে এই অরাজকতার জনরোষ থেকে লুম্পেন বাহিনী দের নিরাপত্তা রক্ষাকারী হিসাবে পাহারাদার এই পুলিশ প্রসাশন। আর প্রতিবাদী আন্দোলন কে দমন করতে পীড়ন সাজানো মামলা দিয়ে হেনস্তা জরে ভয় দেখানোর পদক্ষেপ। এই ভাবে বেশীদিন চলবে না। মানুষ মুখিয়ে আছেন এই অরাজকতা দূর্ণীতি, নারী নির্যাতন ধর্ষণ রাজ থেকে বাংলাকে মুক্ত করতে। আমাদের সাহসের সাথে সেই সামাজিক আন্দোলন ছড়িয়ে দেওয়ার দায়িত্ব পালন করার ঐতিহাসিক দাবী। সেই আন্দোলনে জেলার কৃষক ক্ষেতমজুর শ্রমিক সংগঠনের মৈত্রীকে বুথ স্তর পর্যন্ত বিস্তার করার আহ্বান জানান।
সম্মেলন মঞ্চে অভিনন্দন জানিয়ে বক্তব্য রাখেন অভ্যর্থনা কমিটির সভাপতি শ্রমিক নেতা অশোক সাঁতরা।

সম্মেলন থেকে ৮২ জনের জেলা কাউন্সিল গঠিত হয়। নতুন মুখ এসেছেন ২৬ জন। পরবর্তীতে আরো নতুন মুখ ৫ জন কে নেওয়া হবে। এছাড়া কাউন্সিল কমিটিতে বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন আদিবাসী অধিকার মঞ্চ, আদিবাসী ও লোক সংস্কৃতি মঞ্চ, সামাজিক ন্যায় মঞ্চের জেলা সম্পাদকরা স্থান পেয়েছেন। সম্পাদক পদে পুন নির্বাচিত হয়েছেন মেঘনাদ ভূঁইয়া এবং সভাপতি নির্বাচিত হোন প্রানকৃষ্ণ মন্ডল।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *